Saturday, 5 June 2010

আমার দেশ বন্ধ করা প্রসঙ্গে কিছু প্রশ্ন

আতাউস সামাদ

প্রথমেই অকপটে স্বীকার করে নিচ্ছি যে কয়েকটি পত্রিকা ও বেতার-মাধ্যমের জন্য আমি একটু আলাদা টান অনুভব করি। যেকোনো মানুষ অনেক দিন ধরে একটা প্রতিষ্ঠানে কাজ করলে সেটার জন্য তাঁর মনে বিশেষভাবে খানিকটা জায়গা থাকবেই। কিন্তু সে অর্থে নয়, একেক বিশেষ কারণে একেকটা পত্রিকা, রেডিও ও টেলিভিশনকে মনে পড়ে, আমি সে কথাই বলছি। যেমন_ষাটের দশকে পাকিস্তান অবজারভারে কাজ করার সময় আমরা কয়েকজন মিলে খবর, ভাষ্য ও মন্তব্য লিখে দেশে যে কী চাঞ্চল্য তৈরি করে ফেলতাম, তা এখনো অবাক হয়ে ভাবি। সাপ্তাহিক হলিডে পত্রিকার সম্পাদক বন্ধুবর এনায়েতুল্লাহ খানের সঙ্গে দেশের, বিশেষ করে রাজনীতির গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে প্রতিনিয়ত মতান্তর ঘটলেও বহুবছর প্রতি সপ্তাহে লিখেছি। কারণ তথ্য ও অভিমতের মিশেল দিয়ে মনের কথা লেখার জন্য ওই পত্রিকাই যেন ছিল আমার জন্য নির্ধারিত স্থান। বিবিসির কথা ভুলি না এ জন্য যে এখানে কাজ করার সময় যেন ঘুমের মধ্যেও চিন্তা করতে হতো, এখনই লন্ডন থেকে একটা ফোন আসবে যে আধঘণ্টার মধ্যে অমুক-তমুক বিষয়ে একটা পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন চাই, সে রকম ক্ষেত্রে কিভাবে যেন কাজটা করে দিতাম।

দৈনিক আমার দেশ আর এনটিভির জন্যও আমার বিশেষ টান আছে। আর তা এ জন্য যে দুটো প্রতিষ্ঠানেরই খুব বড় দুর্যোগের সময় আমার ওপর হাল ধরার দায়িত্ব বর্তেছিল। আল্লাহর অশেষ কৃপায় এবং সহকর্মীদের সহযোগিতায় এনটিভিকে ঝড়ঝঞ্ঝা পার করে নিরাপদ পাড়িতে রেখে আসতে পেরেছিলাম। দৈনিক আমার দেশের হাল ধরতে হয়েছিল সহকর্মীদের অনুরোধে। এক সংকটময় রাতে তাঁরা বললেন, পত্রিকাটি বন্ধ হওয়ার হুমকির মুখে, তবু তাঁরা বেতন না নিয়ে এবং অন্যান্য কষ্ট সহ্য করে তাঁদেরই উদ্যোগে এর প্রকাশনা চালিয়ে যেতে চান; তবে সে জন্য তখন থেকেই আগামী কিছুদিনের জন্য হলেও ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে আমার নাম ব্যবহার করতে দিতে হবে। তার পরের চার-পাঁচ মাস ছিল ওই পত্রিকায় কর্মরত আমাদের জন্য একটা কঠিন পরীক্ষা ও কঠোর সংগ্রামের সময়। মূলধন নিঃশেষিত ও ঋণের ভারে ন্যুব্জ, বলতে গেলে প্রায় দেউলিয়া প্রতিষ্ঠানটি সেই সময় প্রকৃত অর্থেই বেঁচে গিয়েছিল কর্মীদের ঘাম আর চোখের পানির বিনিময়ে। এর মধ্যেই আমাদের খুঁজতে হয়েছে নতুন মালিক। বিরাট ধনী এমন বেশ কয়েকজনের কাছেই গেছি। সাড়া দিয়েছেন কমই। শেষ পর্যন্ত মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন সবাই।

শেষ পর্যন্ত প্রকৌশলী মাহমুদুর রহমানের কাছে হাজির হই দুই কারণে। প্রথমত, আমার 'সাপ্তাহিক এখন' পত্রিকায় (বর্তমানে সেটির মালিক সাংবাদিক শওকত মাহমুদ) তাঁকে অংশীদার হতে অনুরোধ করায় তিনি সম্মত হয়েছিলেন। দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগ বোর্ডের সাবেক নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি অনেক পুঁজিপতিকে চিনতেন বিধায় তাঁর পক্ষে আমার দেশ পত্রিকার জন্য নতুন বিনিয়োগকারীদের সংগঠিত করা সম্ভব হতে পারে। আমারই অনুরোধে তিনি সাপ্তাহিক এখন বাদ দিয়ে আমার দেশ পত্রিকার জন্য মাঠে নামলেন এবং কয়েকবার আশাভঙ্গ হওয়ার পর শেষ পর্যন্ত তুলনামূলকভাবে তরুণ কয়েকজন ব্যবসায়ী বন্ধুকে নিয়ে দৈনিক আমার দেশের মালিকানা নিলেন। আমরা কর্মচারীরা পত্রিকা চালানোর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেলাম। আমরা বেতন পেতেও শুরু করলাম।

তখনকার সেই সংকট কেটে যাওয়ার কিছুদিন পর কিছুটা নির্ভার হওয়ার জন্য এবং ইচ্ছামতো সময় কাটানোর আশায় চাকরি ছেড়ে দিই। লেখালেখি নিয়ে আছি। তবে এনটিভি ও দৈনিক আমার দেশের সংগ্রাম_দুটোর কথা সব সময়ই মনে পড়ে। প্রতিষ্ঠান দুটির জন্য আমার মনে আলাদা টান এ জন্যই।

এখন একটা সরকারি সিদ্ধান্তে যে আমার দেশ পত্রিকা বন্ধ এবং ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হলো_এ দুটো ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই আমাকে ক্ষুব্ধ, দুশ্চিন্তিত ও মর্মাহত করেছে। একটা দল নির্বাচনে জাতীয় সংসদে আসনসংখ্যায় মহাবিজয় নিয়ে ক্ষমতায় বসার পর থেকে তার আশ্রিত বহু ব্যক্তি রাতারাতি দুর্বৃত্তে পরিণত হলো, তা দেখে স্তম্ভিত হলাম। দেশজুড়ে দুর্জনরা প্রতিদিন যেসব জঘন্য অপরাধ করছে, তা রোজই আমাদের ভয়, আতঙ্ক ও লজ্জার অন্ধকার জগতে ঠেলে দিচ্ছে। এসবের প্রতিকার করা তো দূরের কথা, সরকার নিজেই এখন দুঃশাসনের পথে আসুরিক নৃত্য করতে করতে ধেয়ে চলেছে। আমরা এসবের তীব্র নিন্দা করছি ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। একই সঙ্গে অবিলম্বে আমার দেশ পত্রিকা প্রকাশের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, তার বন্ধ প্রেস খুলে দেওয়ার এবং ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের মুক্তি দাবি করছি। সরকারকে অনুরোধ করব চ্যানেল ওয়ানের পুনঃসম্প্রচার শুরু করার পথের বাধা দূর করে সেটি পুনরায় চালু করতে (যন্ত্রপাতির মালিকানা, ব্যাংকের ঋণ শোধ, বিটিআরসির ফ্রিকোয়েন্সি বরাদ্দ_এগুলো সম্পর্কে আদালত ও আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব) এবং যমুনা টেলিভিশনের সম্প্রচার আবার শুরু করার জন্য সরকারের যে অনাপত্তি প্রয়োজন, তাও অবিলম্বে দিয়ে দিতে। পিএসটিএন ও ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারগুলোর হাজার হাজার ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এখন যে অচলাবস্থার মধ্যে পড়েছেন, সেই সমস্যারও সমাধান হওয়া দরকার। আর ফেইসবুক বন্ধ করা! সেটা নিয়ে তো বাংলাদেশ সরকারই বেশি সমস্যায় পড়েছে বলে মনে হচ্ছে।

আমার দেশ পত্রিকা বন্ধ এবং এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গ্রেপ্তার করতে সরকার যা যা করেছে, তার সবই প্রশ্নবিদ্ধ। আমার দৃষ্টিতে কিছু বেআইনি কাজও হয়েছে। ওই পত্রিকার সাবেক মালিকদের মধ্যে একজন হাসমত আলী থানায় মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা করার আগে সেই দিনই (গত মঙ্গলবার) এনএসআইয়ের লোকজন তাঁকে বাসা থেকে এনএসআই অফিসে নিয়ে গেল কেন? (তথ্যসূত্র : সাংবাদিকদের কাছে হাসমত আলীর পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য)। হাসমত আলীর অভিযোগ পেয়ে একদল পুলিশ মাহমুদুর রহমানকে গ্রেপ্তার করতে আমার দেশ অফিসে ছুুটে গেল, কিন্তু তারা কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বা পত্রিকা বন্ধ করার কোনো লিখিত নির্দেশ দেখাল না কেন? আর সে জন্যই ওই হানা ও গ্রেপ্তার জনগণের চোখে বেআইনি প্রতীয়মান হয়েছে। জনমনে এ প্রশ্নও জেগেছে, রোজ যারা চাপাতি ঘোরাচ্ছে আর টেন্ডার ছিনতাই করছে, পুলিশকে সেসব দুর্বৃত্ত ধরতে তো আগে এমন তৎপর দেখা যায় না। একই রকমভাবে আমার দেশ পত্রিকার ছাপাখানা বন্ধ করার জন্য।
যে পুলিশ বাহিনী গিয়েছিল, তারাও প্রেসে উপস্থিত কর্মকর্তাদের কোনো লিখিত সরকারি হুকুম দেখায়নি!

তদুপরি যদিও আমার দেশ বন্ধ করার জন্য সরকারি তৎপরতা সারা দিন লক্ষ করা গেছে, তবু পুলিশি হানা ঘটেছে গভীর রাতে। আমার দেশ পত্রিকা অফিসে সাংবাদিক ও উপস্থিত অন্য কর্মচারীরা পুলিশকে ঢুকতে যে বাধা দিয়েছিলেন, তার কারণ ছিল পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো গ্রেপ্তারি বা তল্লাশি পরোয়ানা দেখাতে না পারা।

আর সরকার যেভাবে আমার দেশ পত্রিকাকে প্রকাশকবিহীন করে ফেলল, সেটা যে ইচ্ছাকৃত বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, তাও পরিষ্কার। কারণ আমার দেশ পত্রিকার স্বত্বাধিকারী কম্পানি আমার দেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদ মাহমুদুর রহমানকে ওই পত্রিকার প্রকাশক নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরপরই আইন অনুসরণ করে তিনি ঢাকার ডেপুটি কমিশনারকে তা জানিয়ে সেমতে প্রকাশকের নাম পরিবর্তন করার অনুরোধ করে চিঠি দেন ২০০৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর। অতঃপর তিনি ৫ নভেম্বর ২০০৯ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের কাছ থেকে একটি চিঠির অনুলিপি পান, যা তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠানো হয়েছিল। এই চিঠিটি ঢাকার জেলা প্রশাসক বরাবর পাঠিয়েছেন ওই অধিদপ্তরের উপপরিচালক (নিবন্ধন) মাসুদা খাতুন 'জেপ্রঢা/প্রকাঃ/২০০৯/৬৬৮ (সং), তারিখ : ১২-১০-২০০৯'_এই সূত্র ধরে। এই পত্রে সরকারের চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর, ঢাকার জেলা প্রশাসককে জানাচ্ছে "...ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক 'আমার দেশ' পত্রিকাটির প্রকাশক জনাব আলহাজ মোঃ হাসমত আলী-এর পরিবর্তে জনাব মাহমুদুর রহমানের নাম প্রতিস্থাপন করার অনুমোদন দেয়া যেতে পারে।' কিন্তু ঢাকার জেলা প্রশাসক তা সত্ত্বেও সেই নভেম্বর মাস থেকেই জনাব মাহমুদুর রহমানের আবেদনে সাড়া দিলেন না। সরকারের মতামত জানার পরও তিনি সাত মাস নির্লিপ্ততা ও নিঃশব্দতা অবলম্বন করলেন! যখন উঠে বসলেন, তখন যেন হুংকার দিলেন, 'না, মাহমুদুর রহমান প্রকাশক পদে গ্রহণযোগ্য নন, কাজেই তাঁর আবেদন খারিজ করা হলো।' একই সঙ্গে তিনি আমার দেশ পত্রিকার প্রকাশক পদ থেকে জনাব হাসমত আলীর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে এই মুহূর্তে পত্রিকাটির কোনো প্রকাশক নেই ঘোষণা করে তার প্রকাশনা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দিলেন। এখানে তিনটি প্রশ্ন ওঠে : ১. সরকারের চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের চিঠির মূল্য তাহলে কী; ২. জনাব মাহমুদুর রহমানের আবেদন পাওয়ার পর ৯ মাস ঢাকার ডেপুটি কমিশনার নীরব ও নিশ্চল হয়ে থাকলেন কেন এবং ৩. মাহমুদুর রহমান প্রকাশক হওয়ার আবেদন করেছিলেন আমার দেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেডের বোর্ড অব ডিরেক্টরসের সিদ্ধান্তক্রমে অর্থাৎ কম্পানির পক্ষে, সে ক্ষেত্রে ডেপুটি কমিশনার তথা সরকার যদি তাঁকে প্রকাশক হওয়ার যোগ্য মনে না করেন, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সরকারের কর্তব্য ছিল ওই কম্পানির কাছে বিকল্প নাম চাওয়া। কেন সরকার আমার দেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেডকে সেই সুযোগ দিল না? আশা করব, সরকার এসব প্রশ্ন এখনো বিবেচনায় নেবে এবং আমার দেশের প্রকাশনা সম্পর্কে তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবে।

এখানে আরো দুটি প্রশ্ন আসে। আমার দেশ পত্রিকা ও চ্যানেল ওয়ান সরকারের কাছ থেকে যথাযথ ও বৈধ অনুমতি নিয়ে ব্যবসা করছিল, অর্থাৎ এগুলো চালু ছিল এবং যমুনা টেলিভিশন একটি অনাপত্তিপত্রের ভিত্তিতে পরীক্ষামূলক সম্প্রচার চালাচ্ছিল। এই তিনটি প্রতিষ্ঠানেরই প্রচুর মূলধন বিনিয়োগ আছে। অথচ এ ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, মূলধন বিনিয়োগ করে যে ব্যবসা চালু হয়েছে, সরকার সেই রকম বৈধ ব্যবসা বন্ধ করে দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে দেশি বা বিদেশি কোনো ব্যবসায়ী নতুন বিনিয়োগ করতে উৎসাহী হবে কিভাবে? অথচ সরকার নাকি বিনিয়োগ চায়! নতুন বিনিয়োগের অভাবে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কম হচ্ছে! দ্বিতীয়ত, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অল্প কয়েক দিন আগে বলেছেন, মূল্যস্ফীতি সহনীয় করার জন্য দেশের মানুষের আয় বাড়াতে হবে। কিন্তু একের পর এক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়ে বা তাদের ব্যবসা বন্ধ করে দিয়ে সরকার নতুন বেকারত্ব সৃষ্টি করছে। তাহলে কি জনগণকে এই ধারণা নিয়ে থাকতে হবে যে এই সরকার মুখে একরকম বলে আর কাজ আরেক রকম করে? সরকারকেই বলব বিষয়টি চিন্তা করে দেখতে।
সবশেষে দুটি ভুল সংশোধন। আমার গত সপ্তাহে এই কলামে লিখেছিলাম, চাঁদে অবতরণকারী মার্কিন নভোচারী নীল আর্মস্ট্রং পরে সিনেটর হয়েছিলেন। আসলে সিনেটর হয়েছিলেন পৃথিবী প্রদক্ষিণকারী নভোচারী জন গ্লেন। দ্বিতীয়ত, আমি লিখেছিলাম একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বিশ্বের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য সাঁতারু আব্দুল মালেক কলকাতায় টানা ৯১ ঘণ্টা সাঁতরেছিলেন।আসলে বাংলাদেশের বিশিষ্ট সেই সেই সাঁতারুর নাম হবে অরুণ কুমার নন্দী। আমার ভুল ধরিয়ে দেওয়ার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা প্রকৌশলী অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী ও সাংবাদিক এবিএম মূসার কাছে কৃতজ্ঞ থাকলাম।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
(সুত্র, কালের কন্ঠ, ০৫/০৬/২০১০)

সত্য হননের এই নষ্ট পথে

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী

অগ্রজ সাংবাদিক এবিএম মূসা এক টিভি টকশোতে বলেছিলেন, ‘কোনো সরকার যখন জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন তারা মিডিয়ার ওপর খড়গহস্ত হয়।’ বর্তমান সরকার মাত্র দেড় বছরেই মিডিয়ার ওপর খড়গহস্ত হয়ে প্রমাণ করেছে, তাদের পায়ের নিচের মাটি সরে গেছে, জনগণের সাথে তারা সম্পূর্ণ সম্পর্কচুøত হয়ে পড়েছে। এরই জের হিসেবে গত ১ জুন সরকার বন্ধ করে দিয়েছে বহুল প্রচারিত ও আদৃত দৈনিক আমার দেশ। সেই সাথে গ্রেফতার করা হয়েছে আমার দেশ-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে। এর আগে সরকার বন্ধ করে দেয় যমুনা টিভির পরীক্ষামূলক সম্প্রচার। বন্ধ করে দিয়েছে চ্যানেল ওয়ান। এই টিভি দু’টি বন্ধ করে দেয়া ছাড়াও মত প্রকাশের স্বাধীনতা রোধ করার জন্য সরকার অন্যান্য টিভি চ্যানেলের টকশো নিয়ন্ত্রণের জন্য জারি করেছে বিভিন্ন বাধানিষেধ। সেসব বাধানিষেধ মেনে টকশো প্রচার করতে না পেরে কোনো কোনো টিভি চ্যানেল তাদের জনপ্রিয় টকশো বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। এখন টিভির সরাসরি সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানগুলোতে আওয়ামী লীগের সমর্থকদেরই জয়জয়কার। ভিন্ন মত নেই বললেই চলে।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মিডিয়ার ওপর এই জবরদস্তি পুরোদমে শুরু হয়েছে। মইন-ফখরের দুই বছরের স্বৈরশাসনকালেও মিডিয়া যে সাহসের পরিচয় দিয়েছিল, তা প্রশংসার দাবিদার। যদিও সে সময় কোনো কোনো মিডিয়া ওই অসাংবিধানিক সরকারের অনুকূলে প্রাণপণ কাজ করে গেছে। ওই সরকারও প্রধানত স্যাটেলাইট টেলিভিশনগুলোর ওপর নানা ধরনের খবরদারি চালিয়েছে। তা সত্ত্বেও কোনো কোনো ব্যক্তি সে সময় অত্যন্ত সাহসী ভূমিকা নিয়ে বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা অটুট রাখার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। বেশ কিছু পত্রপত্রিকা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে রাজনীতি ও গণতন্ত্র সংরক্ষণের অনুকূলে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছে। এবং আমরা দাবি করতে চাই, ওই অসাংবিধানিক সরকারের পিছুহটা ও ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার জন্য মিডিয়াই মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে।

মইন-ফখরের সরকার রাজনীতিকদের চরিত্র হননের জন্য দেশে নিরাজনীতিকীকরণের উদ্যোগ নিয়েছিল। দল-মত নির্বিশেষে রাজনীতিকদের চরিত্র হননের জন্য যখন মইন-ফখর সরকার উন্মত্ত হয়ে পড়েছিল, যখন এর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিরোধের কোনো সুযোগ ছিল না, তখন কিছুসংখ্যক মিডিয়াব্যক্তিত্ব তার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিলেন। মিডিয়ার নগণ্য কর্মী হিসেবে সেটাকেই আমরা কৃতিত্ব বলে দাবি করতে চাই। আমরা দেখেছি, যারা আওয়ামী লীগের রাজনীতির ঘোর বিরোধী, তারাও শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মইন-ফখরের অপপ্রচার রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, শিল্পপতিদের বিরুদ্ধে মইন-ফখর সরকারের ধারাবাহিক নিকৃষ্ট অপপ্রচার, তাদের চরিত্র হনন, তাদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের স্বীকারোক্তি আদায় প্রভৃতি বিষয়ে সোচ্চার ছিল বেশ কয়েকটি সংবাদপত্র এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে দু-একটি টিভি চ্যানেল। ওই সরকার রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে হেন অপপ্রচার নেই যা করেনি। কিন্তু তার পরও জনমত রাজনীতিকদের অনুকূলে রাখার জন্য মিডিয়া বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছিল। শেখ হাসিনাকে যে তারা নির্বাসন দিতে পারেনি, তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ যে দাঁড় করাতে পারেনি, তার জন্য মিডিয়ার অবদান ছিল অপরিসীম। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে পেয়ে সেই শেখ হাসিনাই মিডিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে বসেছেন। একে একে বন্ধ করে দিচ্ছেন টিভি চ্যানেল ও সংবাদপত্র।

কিন্তু কী দোষ আমার দেশ ও তার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের? এই পত্রিকা এবং সম্পাদকের অপরাধ হলো, তারা অকুণ্ঠিতভাবে কিছু কিছু সত্য প্রকাশ করছিলেন। সে সত্য কখনো কখনো শাসকগোষ্ঠীর কালিমালিপ্ত মুখ উন্মোচিত করে দিয়েছে এবং সেইটুকু সহ্য করার ক্ষমতা ও মানসিকতা শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে বড় অভাব। সংবাদপত্র সত্য প্রকাশ করে গণতন্ত্রকে সুসংহত করার জন্য। ন্যায়বিচার সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য এবং সর্বোপরি শাসকগোষ্ঠীকে সংশোধিত হওয়ার জন্য। এখানে ব্যক্তিগত অসূয়াবিদ্বেষ নেই। যদি ব্যক্তিগত অসূয়াবিদ্বেষ প্রকাশিত হয়, তাহলে জনগণই সেই সংবাদপত্রকে প্রত্যাখ্যান করে। যখন সংবাদপত্র সত্য প্রকাশে বিদ্বেষহীন থাকে, তার পাঠকপ্রিয়তা ক্রমেই বাড়তে থাকে। আবার এই সত্যের পথ থেক্ষে বিচুøত হলে সেই সংবাদপত্র পাঠকপ্রিয়তা হারায়। এই বাংলাদেশেও আমরা দেখেছি যে, সত্যের পথ থেকে বিচুøত হলে একেবারেই শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র পাঠকপ্রিয়তার দিক থেকে সর্বনিØে নেমে এসেছে। আমার দেশ পাঠকপ্রিয়তার দিক থেকে সত্য প্রকাশের কারণে ক্রমেই ঊর্ধµমুখী। অসাংবিধানিক স্বৈরাচারী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বেগম খালেদা জিয়া, শেখ হসিনাসহ রাজনীতকদের বিরুদ্ধে যখন কুৎসা প্রচার করা হচ্ছিল, তখন আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান সেই সব অপপ্রচারের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রতিবাদ উচ্চারণ করেছিলেন। আমরাও ওই অসাংবিধানিক সরকারের রাজনীতিকদের চরিত্রহননের বিরুদ্ধে কলম ধরেছি। জনমত গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র পরিবেশে হলেও চেষ্টা করেছি। তার ফলে মইন-ফখরের উচ্চাভিলাষী সরকার শেষ পর্যন্ত লেজ গুটিয়ে নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়েছিল।

আমরা ধারণা করেছিলাম, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে মিডিয়ার এই অবদানের কথা তারা মনে রাখবে এবং মিডিয়ার স্বাধীনতা নিশ্চিত করবেন। কিন্তু সে আশা কুহকে পর্যবসিত হয়েছে। এই সরকার মইন-ফখরের সরকারের মতোই মিডিয়ার ওপর হামলে পড়েছে। নিুমানের কূটকৌশল প্রয়োগ করে এরা একের পর এক বন্ধ করে দিয়েছে টিভি চ্যানেল ও সংবাদপত্র। দারুণ বলেছেন তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ। হাত-পা ঝাড়া দিয়ে তিনি বলেছেন, তথ্য মন্ত্রণালয় কোনো সংবাদপত্র বন্ধ করেনি। অর্থাৎ দৈনিক আমার দেশ বন্ধের দায় তথ্য মন্ত্রণালয়ের নয়। যেন এই মন্ত্রণালয় সরকার থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ।

কিন্তু মিডিয়ার বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যেরই অংশ। ১৯৭২-৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকালেও ঘটেছিল একই ধরনের ঘটনা। শেখ মুজিবুর রহমান তার সারা জীবনের রাজনীতি নিয়োজিত করেছিলেন গণতন্ত্রের জন্য, বাক ও ব্যক্তিস্বাধীনতার জন্য এবং সন্দেহ নেই, সে লড়াইয়ে তিনি শত ভাগ আন্তরিক ছিলেন। কিন্তু ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে পাওয়ার পর শেখ মুজিবুর রহমান ভিন্ন মত এবং সত্যভীতু হয়ে পড়েছিলেন। তখন বিটিভি ছাড়া আর কোনো টিভি চ্যানেল ছিল না। ছিল কিছু ভিন্ন মতের সংবাদপত্র। এসব সংবাদপত্র সরকারের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অন্যায়-অবিচারের কথা প্রকাশ করে দিচ্ছিল। এবং শেখ মুজিবুর রহমান তার দীর্ঘকালের গণতান্ত্রিক রাজনীতির ধারার ব্যত্যয় ঘটিয়ে সংবাদপত্রের ওপর দলননীতি শুরু করেন। সাংবাদিকদের হতে হয় নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার। তখন বিরোধীদলীয় পত্রিকা গণকণ্ঠ অফিসে প্রতিদিন হামলা চালিয়েছে সরকারের পুলিশ বাহিনী। প্রেসে ঢুকে ভেঙে দিয়েছে পত্রিকার গ্যালি। গ্রেফতার করা হয়েছিল পত্রিকার সম্পাদক কবি আল মাহমুদকে। হামলা করা হয়েছিল মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী প্রকাশিত হক কথার ওপর। গ্রেফতার করা হয়েছিল এর সম্পাদককে। বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল সাপ্তাহিক মুখপত্র স্পোকসম্যান ও লাল পতাকা। এর সম্পাদকদেরও গ্রেফতার করা হয়েছিল। সাপ্তাহিক হলিডে সম্পাদকের বিরুদ্ধে জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে যে ইতর বক্তব্য দেয়া হয়েছিল, তা এখনো লজ্জার সাথে স্মরণ করা হয়। হলিডে সম্পাদককে গ্রেফতার করে কারাবন্দী করেছিল শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার। এভাবে সারা দেশে বন্ধ করে দেয়া হয় বিভিন্ন সংবাদপত্র। গ্রেফতার হন সংবাদপত্রের সম্পাদকরা।

এর কারণ ছিল একটাই। সংবাদপত্র সত্য প্রকাশ করছিল। এ ছাড়া সে সময় সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনাও ছিল দৈনন্দিন বিষয়। তখনো সরকার প্রতিদিন উচ্চৈঃস্বরে নিজেদের সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী বলে ঘোষণা করে যাচ্ছিল। সেখানেও মিথ্যাচারই ছিল প্রধান অবলম্বন। ফলে সাংবাদিক ও সাংবাদিকদের ইউনিয়ন প্রায় বিপন্ন হয়ে পড়ে। ১৯৭৪ সালের মধ্যেই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। এ জন্য ১৯৭৪ সালের ৬-৮ জুলাই অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। নির্মল সেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় গৃহীত প্রস্তাবে সংবাদপত্র দলনে এই মানসিকতার তীব্র সমালোচনা করা হয়। তাতে দুঃখের সাথে বলা হয় যে, আওয়ামী লীগ সাংবাদিকতার স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করলেও এখন সাংবাদিকদের নির্যাতনের পথই তারা বেছে নিয়েছেন। ওই প্রস্তাবে বলা হয়, ‘এক কালের প্রেস ট্রাস্টের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করলেও আজকের সরকার এই কয়েকটি পত্রিকার সাথে প্রেস ট্রাস্ট-সুলভ আচরণ করছেন। ফলে জনচক্ষে এই পত্রিকাগুলো হেয়প্রতিপন্ন হচ্ছে। তবে আজকের এই পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক। এমন কথাও বলা হচ্ছে যে, দেশে দুই-তিনটির বেশি সংবাদপত্রের অস্তিত্ব থাকবে না। এমনও বলা হচ্ছে, যেকোনো মুহূর্তে সব পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া হতে পারে। অথবা নিউজপ্রিন্ট বা বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ করে সংবাদপত্রগুলোকে স্বাভাবিক মৃতুøর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগসহ দেশের সব সরকার-সমর্থক ও বিরোধী দলের প্রতি আমাদের আবেদন, আপনারা পরিস্থিতি অনুধাবন করুন। আপনাদের পূর্বপ্রতিশ্রুতি রক্ষা করুন। বাংলাদেশের সাংবাদিকরা সাংবাদিকতার স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রামে আপনাদের সহযোগিতা কামনা করেন।’

কিন্তু এসবে কোনো ফল হয়নি। সংবাদপত্র তথা সত্য প্রকাশ ও মত প্রকাশ দলনের ধারা অব্যাহতই ছিল। সরকার স্বাধীন মত প্রকাশ ও সত্যকে কিছুতেই সহ্য করতে পারছিল না। আর তাই শেষ পর্যন্ত ১৯৭৫ সালের ১৬ জুন মাত্র চারটি সংবাদপত্র সরকারি নিয়ন্ত্রণে রেখে অন্য সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দিয়েছিল শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার। সেই থেকে ১৬ জুন সংবাদপত্রে কালো দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। এবার ১ জুন আরেক কালো দিবসের সূচনা করল শেখ হাসিনার সরকার।

দৈনিক আমার দেশে প্রকাশিত সত্যকে সত্য দিয়ে মোকাবেলা করার শক্তি এই সরকারের নেই। সে কারণে যমুনা টিভি, চ্যানেল ওয়ান ও আমার দেশ বন্ধ করার ক্ষেত্রে সরকার কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। চ্যানেল ওয়ানের বন্ধকী যন্ত্রপাতি কিনে নেয়ার ক্ষেত্রে ত্রুটি ধরে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে চ্যানেলটি। আমার দেশের ডিক্লারেশন বাতিলের অজুহাতটিও ঠুনকো। আমার দেশ কর্তৃপক্ষ এর প্রকাশক ও সম্পাদক পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা বিষয়টি যথাযথভাবে সরকারকে অবহিতও করে। সে ক্ষেত্রে বিষয়টি সরকারি নথিতে অন্তর্ভুক্ত করার দায়িত্ব আমার দেশ কর্তৃপক্ষের নয়, সরকারের। সরকার সে দায়িত্ব পালনে গাফিলতি করেছে। তার জন্য আমার দেশ বন্ধ হবে কোন যুক্তিতে?

কিন্তু জনবিচ্ছিন্ন সরকার যুক্তির ধার ধারেনি। সত্য প্রকাশের ভয়ে প্রতিহিংসায় উন্মত্ত হয়ে সরকার আমার দেশের ওপর হামলে পড়েছে। পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে প্রতারণার অভিযোগ। কারণ তিনি পদত্যাগী প্রকাশকের নামে পত্রিকাটি বের করেছেন। সরকার কেন নবনিযুক্ত প্রকাশকের নিযুক্তির বিষয়ে অবহিত হওয়ার তথ্য দিলো না সেটা জানার বিষয়। অথচ মাহমুদুর রহমান যথাসময়েই তা সরকারকে অবহিত করেছিলেন। আদালত এই মামলায় ইতোমধ্যেই তাকে জামিন দিয়েছেন। মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত আরো একটি মামলা দায়ের করেছে সরকার। তা হলো সরকারি কাজে বাধাদান। অর্থাৎ পুলিশ যখন তাকে গ্রেফতার করতে গিয়েছিল, সেটা সরকারি কাজ। তখন পুলিশকে ভেতরে ঢুকতে দেয়া হয়নি। এ মামলায় তিনি আটক আছেন। এই বাধাদানের জন্য আমার দেশ-এর সব সাংবাদিক-কর্মচারীর বিরুদ্ধে পুলিশ আরো একটি মামলা দায়ের করেছে। মজার মামলা! পুলিশ যখন সেখানে হাজির হয়, তখন আমার দেশের সাংবাদিক-কর্মচারীরা ছাড়াও সে অফিসে উপস্থিত ছিলেন শত শত রাজনীতিবিদ ও পেশাজীবী মানুষ। আমার দেশের ডিক্লারেশন বাতিলে ক্ষুব্ধ ছিলেন তারা। অফিস প্রাঙ্গণে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। তবে কি সরকারি কাজে বাধা দেয়ার জন্য সরকার ১৫ কোটি মানুষের বিরুদ্ধেই মামলা দায়ের করবে?
পরিস্থিতি সে রকমই দাঁড়িয়েছে। কিন্তু আমরা মনে করি, গণতন্ত্র বিকাশের স্বার্থে সংবাদপত্র দলনের এই নষ্ট পথ সরকারের পরিহার করা উচিত। আমরা অবিলম্বে আমার দেশের পুনঃপ্রকাশ ও সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করছি। সে পথেই গণতন্ত্রের বিকাশ ও সরকারের স্থিতি।
লেখকঃ সাংবাদিক ও সাহিত্যিক
(সুত্র, নয়া দিগন্ত, ০৫/০৬/২০১০)

Friday, 4 June 2010

চাই সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

বাংলাদেশের সাংবাদিক তথা গণমাধ্যম কর্মীদের অনেকে আজ হতাশার সাগরে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন। একের পর এক টিভি চ্যানেল ও সংবাদপত্র সরকার নানা অজুহাতে বন্ধ করে দিচ্ছে। বেকার হয়ে যাচ্ছেন শত শত সাংবাদিক ও গণমাধ্যম কর্মী। এক বিরাট অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে বহু সাংবাদিক পরিবার। আমাদের দূষিত রাজনীতির শিকার এই গণমাধ্যম কর্মীরা। সরকার ভিন্নমত, সমালোচনা সহ্য করতে পারছে না বলে টিভি চ্যানেল ও সংবাদপত্র বন্ধ করে দিচ্ছে। যদিও অজুহাত দেখানো হচ্ছে ভিন্ন কিছু। সরকার গণমাধ্যম নিয়ে সম্প্রতি যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, তার জন্য তাকে একদিন অবশ্যই খেসারত দিতে হবে।

সাংবাদিক ও গণমাধ্যম কর্মীদের এই দুর্দিনে তাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর কথা সাংবাদিক ইউনিয়ন তথা সাংবাদিক নেতাদের। কিন্তু সাংবাদিক ইউনিয়ন তেমন জোরালো ভূমিকা নিতে পারেনি। তেমন ভূমিকা নেয়া ইউনিয়নের পক্ষে সম্ভবও নয়। কারণ পাঠক জানেন, সাংবাদিক ইউনিয়ন দু’ভাগে বিভক্ত। দুটি বড় রাজনৈতিক দলের অনুগত হিসেবে সাংবাদিক ইউনিয়ন দুটি পরিচিত। যদিও এভাবে তাদের আনুষ্ঠানিক পরিচিতি নেই। জাতীয় প্রেস ক্লাবের কমিটিও রাজনৈতিক দলের প্রভাবে প্রভাবিত। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি একটি রাজনৈতিক দলের প্রধানের উপদেষ্টা। অন্য কোন দেশে এটা সম্ভব হতো কিনা জানি না। বাংলাদেশ সব সম্ভবের দেশ।

রাজনৈতিক দলের সঙ্গে প্রকাশ্যে সম্পৃক্ত থেকে পেশাজীবী সাংবাদিক হওয়া সম্ভব কিনা, তা বিতর্কের দাবি রাখে। কোন দলের প্রতি সমর্থন বা পক্ষপাত থাকা স্বাভাবিক। তবে দলের ক্যাডার হয়ে সাংবাদিকতা করা নৈতিক দিক থেকে কতটা সমর্থনযোগ্য, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। এমন সাংবাদিক নেতা ও সাংবাদিকরা বাংলাদেশে সাংবাদিকতা পেশাকে কালিমালিপ্ত করেছেন। সাংবাদিকদের এই অনৈক্য এবং তারা বড় কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সুবিধাভোগী হওয়ায় আজ দেশের সাংবাদিক সমাজের ওপর সরকার ও সন্ত্রাসীরা এত আঘাত করার সাহস পাচ্ছে। এ অবস্থায় সাংবাদিক ও গণমাধ্যম কর্মীদের ঐক্য ও পেশার প্রতি দায়িত্বশীলতা আবার ফিরিয়ে আনা জরুরি হয়ে পড়েছে। অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে তাতে আশংকা হয়, আরও টিভি চ্যানেল ও সংবাদপত্রের ওপর আঘাত আসতে পারে। সরকার সরাসরি আঘাত না করে পরোক্ষভাবেও আঘাত হানতে পারে। সেরকম পরিস্থিতি মোকাবেলায় সাংবাদিক ও গণমাধ্যম কর্মীদের প্রস্তুত থাকতে হবে। কিন্তু তাদের নেতৃত্ব দেবে কে? সাংবাদিকদের ইউনিয়ন তো সরকার ও দলের কাছে নতজানু। তাদের কোন স্বাধীন সত্তা নেই। এ ধরনের ইউনিয়ন দিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে কোন আন্দোলন করা খুব কঠিন।
শুধু সরকারের দমননীতি নয়, গণমাধ্যম সম্পর্কে সরকারের সুষ্ঠু নীতির অভাব, বিটিভিকে দলীয়করণ, স্বাধীন বার্তা সংস্থা, প্রেস ইন্সটিটিউট, প্রেস কাউন্সিল, জাতীয় গণমাধ্যম ইন্সটিটিউট ইত্যাদি সরকারি গণমাধ্যম সংস্থাকে কার্যকর করা, স্বাধীনভাবে সাংবাদিকদের কাজের পরিবেশ সৃষ্টি, সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত সাংবাদিকদের হত্যাকাণ্ডের বিচার ইত্যাদি নানা দাবিতে একটি ঐক্যবদ্ধ ইউনিয়নকে সোচ্চার হতে হবে। আজ গণমাধ্যম সেক্টরের চেহারা আগের মতো নেই। সংবাদপত্র, টিভি, এফএম সবখানে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে গেছে। এখন শুধু সংবাদপত্রের সাংবাদিকদের ইউনিয়ন হলে সেটা খুব কার্যকর হবে না। সাংবাদিক ও গণমাধ্যম কর্মীদের সম্মিলিত ইউনিয়ন হতে হবে। শুধু আন্দোলন করার জন্য নয়Ñ নানা গঠনমূলক কর্মসূচিতেও এ ইউনিয়ন যেন অবদান রাখতে পারে।

আমার প্রস্তাব : সংবাদপত্র, টিভি ও বেতারের সাংবাদিক, কলাকুশলী সবার একটি ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম হওয়া দরকার। তার নাম ‘ইউনিয়ন’ হতে হবে, এমন বাধ্যবাধকতা নেই। সেটা ‘গণমাধ্যম ফোরাম’, ‘কেন্দ্র ’ বা ‘মঞ্চ’ হতে পারে। দরকার একটা ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম। সাংবাদিকতা বা গণমাধ্যমে যারা নিবেদিতপ্রাণ পেশাজীবীÑ এ প্লাটফর্ম হবে কেবল তাদের জন্য। সাংবাদিকতা বা গণমাধ্যমে কাজ করে যারা রাজনৈতিক সুবিধা আদায় করতে চায়, তাদের জন্য এ ফোরাম নয়। তাদের জন্য দুটি ‘সাংবাদিক ইউনিয়ন’ তো আছেই। বড় দু’দলের এক দল ক্ষমতায় গেলে তাদের কেউ কেউ নানা সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। সরকারের কাছ থেকে কোন সুবিধা পাওয়ার আশা যারা করবেন না, কেবল তাদের নিয়েই এ প্লাটফর্ম গঠন করতে হবে। তাদের অঙ্গীকার করতে হবে, তারা কোন রাজনৈতিক দলের সদস্য নন। কোন দল বা নেতার প্রতি তাদের আনুগত্য নেই। তারা সম্পূর্ণভাবে পেশাজীবী। যদি ভবিষ্যতে কেউ মন পরিবর্তন করে কোন দলের প্রতি ঝুঁকতে চান, তিনি এ ফোরামের সদস্য পদ ছেড়ে দেবেন। সেই স্বাধীনতা তার সবসময় থাকবে।

এভাবে একটি স্বাধীন গণমাধ্যম ফোরাম গঠন এখন সময়ের দাবি। যারা স্বাধীনভাবে ও নিষ্ঠার সঙ্গে সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেলে কাজ করতে চান, তারা আমার এ প্রস্তাব নিয়ে চিন্তা করবেন আশা করি। এ উদ্যোগ বর্তমান দলকানা সাংবাদিক ইউনিয়নের বিরোধী কোন প্লাটফর্ম হবে না। বর্তমান ইউনিয়ন তাদের দলের (বা সরকারের) সেবা করে যাক। তাতে কেউ বাধা দিচ্ছে না। স্বাধীন গণমাধ্যম ফোরাম গণমাধ্যম কর্মীদের স্বার্থরক্ষায় ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে নানা কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে যাবে। গণমাধ্যম কর্মীদের ওপর ঝড়ঝাপটা এলে তারা যেন সম্মিলিতভাবে মোকাবেলা করতে পারেনÑ সেই দৃঢ়তা এ ফোরামের কাছে সবাই আশা করবে।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর :উন্নয়ন ও মিডিয়া কর্মী
[সূত্রঃ যুগান্তর, ০৪/০৬/১০]

খারাপ দৃষ্টান্ত

সৈয়দ আবুল মকসুদ

গতকালের একটি বিস্ময়কর সংবাদ। দৈনিক আমার দেশের ডিক্লারেশন বাতিল করে পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করতে মধ্যরাতে তার অফিসে শতাধিক পুলিশের অভিযান। ঘটনাটি ষাটের দশকে আইয়ুব আমলে ইত্তেফাক ও সংবাদ পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিল এবং সম্পাদকদের গ্রেফতারের ঘটনাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

রাতে যখন আমার দেশের প্রথম সংস্করণ ছাপা হচ্ছিল, কয়েক হাজার কপি ছাপাও হয়ে যায়, তখন পুলিশ গিয়ে কাগজের প্রেস সিলগালা করে দেয়। ওই প্রেস থেকেই আরও দুটি দৈনিক ছাপা হয়। যে অভিযোগে আমার দেশের ডিক্লারেশন বাতিল ও সম্পাদককে গ্রেফতারের জন্য হানা দেয়া হয়, তা খুবই ঠুনকো।

প্রচলিত আইন অনুযায়ী কাজটি করেছেন ঢাকার জেলা প্রশাসক। আসলে তিনি হুকুমবরদার মাত্র। কাজটি হয়েছে সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে। এবং যে কোন সাধারণ মানুষও বোঝে, সে নির্দেশের পেছনে রয়েছে রাজনীতিÑ আর কিছু নয়।

ভিন্নমত সহ্য করতে না পারা স্বৈরশাসকদের চারিত্র্য। গণতান্ত্রিক শাসকদের কাছে তা প্রত্যাশিত নয়। কিন্তু আমরা এটাও জানি এবং কুড়ি শতকের ইতিহাসও সাক্ষ্য দেয়, গণতন্ত্রের সূতিকাগার থেকেই ফ্যাসিবাদ জš§ নেয়। হিটলার বা মার্কোস নির্বাচিত শাসক ছিলেন। ফ্যাসিবাদের সবচেয়ে বড় শত্র“ সংবাদমাধ্যম। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে হত্যার মধ্য দিয়েই স্বৈরাচারী শাসন শক্তি অর্জন করে।

বর্তমান মহাজোট সরকার সম্পর্কে তাদের প্রতিপক্ষরা বলছেন, তারা বাকশালের পথেই যাচ্ছেন। আমরা তা বিশ্বাস করতে চাই না। গণতন্ত্রের প্রতি শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের অঙ্গীকার অটুট আছে এবং থাকবে, সে বিশ্বাস নষ্ট করতে চাই না। কিন্তু কষ্ট হয়েছে যখন দেখেছি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ই স্বাধীনতার পরেও গণকণ্ঠসহ কয়েকটি কাগজ বন্ধ করে দেয়া হয়।

আমার দেশ কর্তৃপক্ষ গতকালই আশঙ্কা করছিল, তাদের ওপর আঘাত আসতে পারে। একটা চক্রান্ত চলছে, তা তারা টের পেয়েছিলেন। সংবাদ সম্মেলন করে মাহমুদুর রহমান তা বলেছেনও। এর মধ্যেই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর সরকারের অসহিষ্ণুতার লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে। চ্যানেল ওয়ান বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। টকশোর ওপর নানারকম নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। ফেসবুক বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। যমুনা টিভির প্রচারে অনুমতি দিতে সরকার গড়িমসি করছে। এসবই মতপ্রকাশের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞা। বিশেষ করে ভিন্নমতকে সরকারের ভয়।

যে প্রক্রিয়ায় আমার দেশের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদককে গ্রেফতার করা হয়, তাকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। আজ বাংলাদেশে হাজার হাজার রাজনৈতিক সন্ত্রাসী দিনদুপুরে অপরাধ করে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমাদের পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেট তাদের চুলটিও স্পর্শ করেন না। এ অবস্থায় একজন সম্পাদককে ওভাবে গ্রেফতার সাধারণ শিষ্টাচারের প্রতি চরম অসম্মান প্রদর্শন।

একটি কাগজ বন্ধ হলে শুধু পত্রিকার মালিক ক্ষতিগ্রস্ত হন না, কয়েকশ’ পরিবার বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে। এভাবে ভিন্নমতাবলম্বী পত্রিকা বন্ধ করা আর একটি চালু শিল্প-কারখানা বন্ধ করা একই কথা। কোন কাগজের মালিক, প্রকাশক, সম্পাদক অন্যায় করে থাকলে তার বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে। আদালতে বিচারের পর তাদের শাস্তি হতে পারে। কিন্তু কোন অজুহাতেই পত্রিকা বন্ধ করা যায় না। পত্রিকা বন্ধ শুধু মালিকের ক্ষতি নয়, পাঠক ও জনগণেরও ক্ষতি। জনগণের ক্ষতি করার অধিকার কোন সরকারের নেই। সংবাদমাধ্যমের ওপর আঘাত গণতন্ত্রের ওপরই আঘাত। সে আঘাত জনগণের নাগরিক অধিকারের ওপর আঘাত। সে আঘাত মানবাধিকারের ওপর আঘাত।

মাহমুদুর রহমানের রাজনৈতিক বিশ্বাস ও তার নীতি-আদর্শের সঙ্গে আমি মোটেই সহমত পোষণ করি না। কিন্তু তার এই গ্রেফতারকে আমি প্রতিহিংসামূলক কাজ এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিপীড়ন করা ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারি না।

আমি এক সময় একটি দৈনিকের সম্পাদক ছিলাম এবং একজন লেখক ও সচেতন নাগরিক হিসেবে অবিলম্বে মাহমুদুর রহমানের মুক্তি দাবি করি। আশা করি, সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় হবে এবং পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিলের আদেশ বাতিল করে অবিলম্বে আমার দেশ প্রকাশের পথে স্বেচ্ছাচারী বাধা অপসারণ করা হবে।
সৈয়দ আবুল মকসুদ : লেখক ও গবেষক
[সূত্রঃ যুগান্তর, ০৩/০৬/১০]

মাহমুদুর রহমান ও দৈনিক আমার দেশ

ফরহাদ মজহার

বহুল প্রচারিত জাতীয় দৈনিক আমার দেশ পত্রিকা মহাজোট সরকার বন্ধ করে দিয়েছে। বলা বাহুল্য, চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নে যে সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকারের কথা সাধারণত বলা হয়ে থাকে এবং দাবি করা হয় বাংলাদেশের সংবিধান নাকি সেই অধিকার স্বীকার করে­ সেই অধিকার আমরা প্রকাশ্যেই দলিত-মথিত হতে দেখলাম। নাগরিক ও মানবিক অধিকারের ফানুস সশব্দে ফুটা হয়ে গেল আমাদের চোখের সামনেই। স্রেফ গায়ের জোরে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে আমার দেশ। তবুও যাঁরা মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের প্রতি ক্ষমতাসীনদের প্রতিশ্রুতিকে এখনো মূল্য দেন, তারা এর নিন্দা করবেন, নিন্দা করছেনও অনেকে। তবে এগুলো কদলির বাইরের খোসা। কাঁচকলার ভেতরতাও যে কাঁচকলা সেটা আমরা ক্রমে ক্রমে আরো বুঝব।

এ কথা আমি স্বীকার করি, মাহমুদুর রহমান আমার বন্ধু। কিন্তু এই বন্ধুত্বের চরিত্র আলাদা। আমাদের সংস্কৃতিতে বন্ধুত্বকে আমরা ব্যক্তিগত ব্যাপার বলে মনে করি। কিন্তু মাহমুদুর রহমানের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব কোন ব্যক্তিগত কারণে গড়ে ওঠেনি। সেটা গড়ে উঠেছিল রাজনৈতিকতার সংজ্ঞায় শত্রু ও মিত্র নির্ধারণের মানদণ্ড দিয়ে। বাংলাদেশে জনগণের রাজনৈতিক শত্রুদের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলা, সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ রক্ষা করবার জন্য জনগণের বন্ধুদের মধ্যে পথ ও কাজের কৌশলের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও মৈত্রীর পথ অনুসন্ধান, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে অর্থপূর্ণ করে বিশ্বব্যবস্থায় ইজ্জত নিয়ে বাঁচা, বাংলাদেশকে সমৃদ্ধির পথে নেবার নীতি ও কৌশলের জায়গাগুলো পরিষ্কার করা­ ইত্যাদির মধ্য দিয়েই আমাদের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। কয়েকটি বিষয়ে আমাদের চিন্তার ঐক্য দ্রুত আমাদের কাছাকাছি নিয়ে আসে। এক. পরাশক্তির হস্তক্ষেপে এবং বাংলাদেশের কয়েকটি গণমাধ্যম ও তথাকথিত সুশীলসমাজের মীরজাফরী বাংলাদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করবার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে, এদের রুখে দিতে হবে। যারা বাংলাদেশকে ধ্বংস করতে চাইছে সেই সকল গণশত্রুদের বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। দুই. বাংলাদেশকে ইসলামি সন্ত্রাসীদের ‘আখড়া’ প্রমাণ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইজরায়েল ও ভারত বাংলাদেশকে আরেকটি আফগানিস্তান বানাতে চাইছে, তাকে রুখতে হবে। বিশেষত ভারতের শাসক শ্রেণী চাইছে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আড়ালে ভারতের পূর্বাঞ্চলের স্বাধীনতা সংগ্রামকে নিশ্চিহ্ন করবার জন্য বাংলাদেশকে যুদ্ধের ময়দানে পরিণত করা। তিন. বাংলাদেশকে লুণ্ঠনের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করবার ক্ষেত্রে বহুজাতিক কম্পানি ও তাদের স্থানীয় দালালদের তৎপরতা রুখে দেওয়া। বলা বাহুল্য গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী প্রতিটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলে এই দালালরাই সবচেয়ে শক্তিশালী। এক কথায় গণশত্রুদের বিরুদ্ধে গণশক্তির বিকাশ ঘটানোর রাজনৈতিক কর্তব্যই আমাদের বন্ধুত্বের ভিত্তি তৈরি করেছে। শত্রুকে সুনির্দিষ্ট করা ও বন্ধুকে চেনার মধ্য দিয়েই আমরা পরস্পরকেও চিনেছি।

ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের রাজনৈতিক দিক নিয়ে কথা বলছি কারণ এখন অনেকে আমার দেশ পত্রিকা ও মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে সরকারের আচরণের নিন্দা করছেন। কিন্তু অনেকে তাঁদের ব্যক্তিগত পাতি বুর্জোয়া অহঙ্কার কাটিয়ে উঠতে পারছেন না দেখে তাঁদের প্রতি আমার করুণা হচ্ছে। অনেকে দাবি করছেন মাহমুদুর রহমানের সঙ্গে তাঁদের চিন্তা, জীবনবোধ ইত্যাদির নাকি পার্থক্য আছে। কী পার্থক্য? করুণা হয় এই কারণে যে তাঁরা খোলাসা করে বলতে পারছেন না কোথায় তাদের পার্থক্য। এই অহঙ্কারকে আমি পাতি বুর্জোয়া বলছি এই কারণে যে রাজনীতিতে শত্রুমিত্র নির্ধারণের প্রশ্ন ঠিক হয় ব্যক্তিগত মতপার্থক্য বা জীবনবোধ নিয়ে ভিন্ন অবস্থান দিয়ে নয়, বরং বর্তমানের রাজনৈতিক কর্তব্য চিহ্নিত করার মধ্য দিয়ে। সেই দিক থেকে ওপরে বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে যে তিনটি অবস্থানের কথা বলছি, সেই অবস্থান নিয়ে বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক মিত্রদের সঙ্গে অবশ্যই তর্ক হতে পারে, কিম্বা নতুন প্রসঙ্গ যুক্ত হতে পারে। কিন্তু শত্রু নির্ধারনের প্রশ্নে যদি আমরা সুস্পষ্ট থাকি তাহলে ঠিক এই সময়ে, যখন ফ্যাসিবাদ তাঁর হিংস্র থাবা নিয়ে আমার দেশ ও মাহমুদুর রহমানকে ধ্বংস করতে উদ্যত তখন এই ‘ব্যক্তিগত’ মতপার্থক্যকের কেচ্ছা শোনানো শেয়াল পণ্ডিতের মতো হাস্যকর শোনায়। সরকারের নিন্দা তখন হিপোক্র্যাসি হয়ে ওঠে।

প্রথম আলোয় মিডিয়া ভাবনায় মুহম্মদ জাহাঙ্গির লিখছেন, “পাঠক জানেন, আমার দেশ একটি বিরোধী দল সমর্থিত পত্রিকা। শুরু থেকেই পত্রিকাটি সরকারের নানা সমালোচনা করছে। বিরোধী দলের পত্রিকা যেমনটি হয়। তা ছাড়া পত্রিকাটি একটি বিশেষ বিরোধী দলের মুখপত্রের মতো সাংবাদিকতা করে থাকে। সংবাদপত্রে এ ধরনের ‘দলীয় মুখপত্র’ কতটা সমর্থনযোগ্য, সেটা ভিন্ন প্রশ্ন। সেই বিতর্ক হতেই পারে। কিন্তু দেশে যখন বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু রয়েছে, তখন ভিন্নমতের সংবাদপত্রকে সহ্য করতে সরকার বাধ্য। ভিন্নমতের সংবাদপত্র ও টিভি গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত। সরকার আমার দেশ পত্রিকা বন্ধ ঘোষণা করে গণতন্ত্রের প্রতি তাদের অঙ্গীকারের দুর্বলতাই প্রকাশ করেছে। আমার বিশ্বাস, সরকারের বহু সমর্থকও এই পদক্ষেপকে সমর্থন করতে পারছে না।”

প্রশ্ন হোল, এক-এগারোর সময় প্রথম আলোর ভূমিকা এবং বাংলাদেশে জনগণের স্বার্থের বিবেচনায় প্রথম আলোর সাংবাদিকতার নীতি কি সমর্থনযোগ্য? আমরা কি সাংবাদিকতার নীতির বিচার নিয়ে এখন তর্ক করব? প্রথম আলো কার স্বার্থ রক্ষা করে? এখন আমার দেশ পত্রিকাকে দলীয় মুখপত্র বলে স্নেহভাজন জাহাঙ্গির তার বাকি কথাগুলোর ওজন কমিয়ে দিয়েছেন। একই তারিখে প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সংযত হলেও আমরা একই সুর শুনি। তারা লিখেছেন, ‘আমার দেশ পত্রিকার মালিকানা, পুঁজি, মালিকানা বদল, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার নীতিমালা কতটা স্বচ্ছ কিংবা নীতিসম্মত ছিল, সে বিষয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। কিন্তু সেটা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিতর্ক। আমরা যে কারণে উদ্বিগ্ন তা হলো, ভিন্নমতকে জব্দ করতে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহারের বিষয়টি।’ বেশ।

কথা হোল প্রশ্ন থাকতে পারে কার? কিসের? মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে প্রথম আলোর ভূমিকা সম্পর্কে আমরা সচেতন ও সজ্ঞান। আমাদের সমাজ বিভক্ত। আমরা কেউ বাংলাদেশ রক্ষা করতে চাই, আর কেউ চায় তা ধ্বংস করতে। এখানে শত্রুমিত্রের বিভাজন তৈরি হয়। ভিন্নমতকে জব্দ করতে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহারের বিষয়টি উদ্বিগ্নের সন্দেহ নাই, কিন্তু ভিন্নমতকে জব্দ করতে প্রথম আলোকে কি ব্যবহার করা হয় নি? অবশ্যই হয়েছে। প্রথম আলো কি স্বেচ্ছায় অন্যের ভাড়া খাটে না? অবশ্যি খাটে। প্রথম আলোর সাংবাদিকতার নীতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন আছে। কথাটা বলছি বাধ্য হয়ে। কারণ প্রথম আলো কথাটা তুলতে চাইছে। আমাদেরও প্রশ্ন, সাংবাদিকতার নীতিমালা প্রথম আলোয় কতটা স্বচ্ছ কিংবা নীতিসম্মত?

আমার দেশ পত্রিকার প্রেস সিলগালা করে বন্ধ করে দেওয়া, মধ্যরাতে বিরাট পুলিশ বাহিনী নিয়ে পত্রিকার সম্পাদককে গ্রেফতার করা, পত্রিকার প্রকাশককে তাঁর বাসা থেকে বিশেষ বাহিনী দিয়ে ধরে নিয়ে যাওয়া ও দুটি সাদা কাগজে প্রকাশকের সই নেওয়া তো মইন উদ্দিন-ফখরুদ্দীন সরকারের আমল থেকেই শুরু হয়েছে। প্রথম আলো ছিল সেই সরকারের সমর্থক। এক-এগারোর সেনাসমর্থিত বিশেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কর্মকাণ্ডের কি সহযোগী ছিল না প্রথম আলো?

তবু আমরা প্রথম আলোসহ গণমাধ্যমের এই অবস্থানের প্রশংসা করি। আমরা অতীতে ভুল করতে পারি। দেশ ও দশের স্বার্থে যথাসম্ভব সকলকে নিয়েই ফ্যাসিবাদী শক্তিকে আমাদের মোকাবেলা করতে হবে। ঘটনার পর্যালোচনা এবং গণশক্তি পরিগঠনের প্রতি লক্ষ রেখে কোন দিকে আমাদের নজর নিবদ্ধ রাখতে হবে সেই দিকগুলো নির্দিষ্ট করাই এখন সকলের কাজ। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে নির্বাহী ও বিচার বিভাগের সম্পর্ক, সংবিধান ও আইনের মধ্যে পার্থক্য, বুর্জোয়া রাষ্ট্রে নাগরিক ও মানবিক অধিকারের প্রতি এক দিকে প্রতিশ্রুতি অন্য দিকে দিকে তার লঙ্ঘন ইত্যাদি দিক কখনো স্পষ্ট আবার কখনো প্রচ্ছন্নভাবে ফুটে উঠেছে। আমার দেশ-এর ডিক্লারেশান বাতিল, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার, ওই পত্রিকার সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ঢালাওভাবে মামলা ইত্যাদির মধ্য দিয়ে এই সম্পর্কগুলোকে যতটুকু সম্ভব আমাদের সবাইকেই বুঝতে হবে।

আমার দেশ পত্রিকার আইনি গাফিলতির যে কাহিনী সরকার ও সরকারের সমর্থকরা বানিয়েছিলেন এবং গণমাধ্যমগুলো মাঝে মধ্যে যার প্রতিধ্বনি তুলছে, তাকে নাকচ করা দরকার। সংক্ষেপে সেই কাজ সম্পন্ন করবার জন্য আমি চিন্তা ওয়েবসাইটের (chintaa.com) শরণাপন্ন হচ্ছি। তাঁদের তৈরি ঘটনাক্রমটাই আমি টুকছি। এবং তাঁদের বিশ্লেষণ।

২৬ এপ্রিল ২০০৯ঃ ঢাকার জেলা প্রশাসককে আমার দেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেড চিঠি দিয়ে জানায় যে, কম্পানির বোর্ড অব ডিরেক্টরসের সিদ্ধান্ত মোতাবেক কম্পানির চেয়ারম্যান মাহমুদুর রহমান আমার দেশের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক নিযুক্ত হয়েছেন। উল্লেখ্য, প্রিন্টিং প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স অ্যাক্ট ১৯৭৩-এর নিয়ম অনুযায়ী সম্পাদক নিয়োগ-প্রত্যাহার-বদল ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনকে জানাতে হয়।

১৬ জুন ২০০৯ঃ জেলা প্রশাসনের তরফে ঢাকার বিশেষ পুলিশ সুপার আমার দেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেডকে জানান যে, নিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের বিষয়ে জেলা প্রশাসনের আপত্তি নেই।

৩ সেপ্টেম্বর ২০০৯ঃ মুদ্রণালয়ের নিয়ন্ত্রক ও মুদ্রাকরের নাম বদলের জন্য কম্পানি আবেদন করে জেলা প্রশাসকের কাছে­ তিয়াত্তর সালের প্রিন্টিং প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স অ্যাক্ট অনুযায়ী। এবং আইনের বিধান অনুযায়ী এই বদলের বিষয়ে আদালতে ঘোষণাপত্র দেয়। একই সাথে পত্রিকার প্রকাশক বদল করে নতুন প্রকাশক হিশাবে মাহমুদুর রহমানের দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়টিও জেলা প্রশাসনকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়।

১১ অক্টোবর ২০০৯ঃ এই দিন সাবেক প্রকাশক হাসমত আলী জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে গিয়ে আইনে নির্ধারিত ফরমে স্বাক্ষর করে ঘোষণা দেন যে, তিনি প্রকাশকের পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। (বিবিসির সাথে সাক্ষাৎকারে জেলা প্রশাসকের দেয়া বক্তব্য অনুযায়ী)।

৫ নভেম্বর ২০০৯ঃ চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর প্রকাশক বদল বিষয়ে এই দিন অনাপত্তিপত্র দেয়। অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাসুদা খাতুন স্বাক্ষরিত ওই পত্রে বলা হয়, ‘আমার দেশ পত্রিকার প্রকাশক আলহাজ্ব মোঃ হাসমত আলীর পরিবর্তে জনাব মাহমুদুর রহমানের নাম প্রতিস্থাপন করার অনুমোদন দেয়া যেতে পারে।’

১৫ মার্চ ২০১০ঃ এই দিন ঢাকার জেলা প্রশাসন এক চিঠিতে আমার দেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেডের কাছে জানতে চায় যে, দৈনিক আমার দেশের প্রিন্টার্স লাইনে কেন এখনো প্রকাশক হিশাবে হাসমত আলীর নাম ছাপা হচ্ছে? জবাবে আমার দেশ চিঠিতে জানায় যে, ৩ সেপ্টেম্বর ২০০৯ তারিখে জেলা প্রশাসনকে মুদ্রণালয়ের নিয়ন্ত্রক-মুদ্রাকর ও প্রকাশক বদল বিষয়ে জানানো হলেও এখনো এ বিষয়ে আপত্তি বা অনাপত্তি জানানো হয়নি। কাজেই প্রিন্টিং প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স অ্যাক্ট অনুযায়ী বাধ্যবাধকতা থাকার কারণে এখনো আগের প্রকাশকের নামই প্রিন্টার্স লাইনে ছাপা হচ্ছে। একই সাথে কম্পানি কর্তৃপক্ষ জেলা প্রশাসনকে অনুরোধ জানায় খুব দ্রুত তাদের আবেদন নিষ্পত্তি করতে।

১ জুন ২০১০ঃ এই দিন রাতে স্থানীয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তার বাহিনী নিয়ে পত্রিকাটির তেজগাঁও শিল্প এলাকস্থ প্রেসে যান এবং প্রেসটি সিলগালা করে বন্ধ ঘোষণা করেন। যদিও সংবাদমাধ্যমকে তারা বলেন যে, পত্রিকাটির কোনো বৈধ প্রকাশক না থাকার কারণে পত্রিকাটির ডিক্লারেশন মানে প্রকাশনা বাতিল করেছে জেলা প্রশাসন, ওই সময় তারা প্রকাশনা বাতিল করা বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্র কর্মরত সাংবাদিক ও কর্মচারীদের বা বাইরে অপেক্ষারত সংবাদমাধ্যমকে দেখান নি। এই প্রতিবেদক ১ জুন দিবাগত রাত নয়টা থেকে শুরু করে ২ জুন ভোর পৌনে পাঁচটাতক পত্রিকাটির কাওরান বাজারস্থ বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগে হাজির ছিলেন, পুরো সময়ে কোনো আনুষ্ঠানিক দলিলপত্র পত্রিকার কার্যালয়ে পৌঁছায় নি জেলা প্রশাসন।

এবং এখনো এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে, লিখিতভাবে ডিক্লারেশন বাতিল করার বিষয়ে পত্রিকাটিকে কিছুই জানায় নি প্রশাসন। অবশ্য বিবিসি রেডিওর বাংলা বিভাগকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ঢাকা জেলা প্রশাসক জনাব মুহিবুল হক কিছু বিষয়ে কথা বলেছেন। অতএব ‘সরকারের বক্তব্য’ কেবল এইটুকুই। সাক্ষাৎকারের প্রচারিত অংশের হুবহু পাণ্ডুলিপি তুলে দিচ্ছি।

জেলা প্রশাসকঃ অ্যাকচুয়ালি আমার দেশ পত্রিকার বর্তমানে কোনো প্রকাশক নেই। নেই বলতে বৈধ কোনো প্রকাশক নেই। কোনো পত্রিকা যদি প্রকাশ করতে হয় তাহলে বৈধ যে আইনটা আছে, ছাপাখানা ও প্রকাশনা আইন ১৯৭৩-এর ৫ ধারা অনুযায়ী একজন প্রকাশক থাকতে হবে এবং ৭ ধারা অনুযায়ী তাকে আমাদের সাথে এখানে একটা ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করতে হবে। এই পত্রিকার যে বৈধ প্রকাশক ছিলেন তিনি আমাদের অফিসে এসে স্বেচ্ছায় নির্ধারিত ফরমে স্বাক্ষর করে, উনি প্রকাশক হিশাবে অব্যাহতি নিয়েছেন।
বিবিসিঃ এটা উনি কবে নিয়েছেন?

উনি নিয়েছেন এগারো দশ দুই হাজার নয় তারিখে। পত্রিকাটার প্রকাশক ছিলেন আলহাজ্ব মোহাম্মদ হাসমত আলী।
এগারো দশ দুই হাজার নয় . . . আর এখন তো দুই হাজার দশ। তো এতদিন ধরে কী হলো­ মানে তখনি কি আপনারা কোনো কারণ জানতে চেয়েছিলেন আমার দেশ পত্রিকার তরফ থেকে, তাদের কাছ থেকে?

হঁ্যা, আমরা তাদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম। অফিসিয়ালি আমরা তাদের চিঠি দিয়েছি। তারা আমাদেরকে রেসপন্স করেছে। তারা আমাদেরকে অফিসিয়ালি জানিয়েছে­ না, এই পত্রিকার আর কোনো প্রকাশক নেই, কাজেই এই পত্রিকা চলতে পারে না। এই কারণে আমরা পত্রিকাটা এখন বাতিল করে দিয়েছি, ঘোষণাটা বাতিল করে দিয়েছি।

আমার দেশকে আপনারা যে চিঠি দিলেন, তার জবাবে তারা স্বীকার করলেন লিখিতভাবে যে তাদের কোনো প্রকাশক নেই?
হঁ্যা, তাদের কোনো প্রকাশক নেই। তারা জানিয়েছে তাদের প্রকাশক নেই।
এবং এটা তারা কবে জানালেন?
এটা তারা আমাদের জানিয়েছেন কয়েক দিন, কিছু দিন, কয়েক দিন আগে আমাদের।
মানে আমার দেশের তরফ থেকে কারা তাহলে আপনাদের চিঠির জবাব দিলেন? মানে প্রকাশক যদি না থাকেন তাহলে কে সেই দায়িত্ব নিয়ে আপনাদের চিঠির জবাব দিলেন?
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক জবাব দিয়েছেন।

আমার দেশ পত্রিকার তরফ থেকে অবশ্য বলা হচ্ছে যে তারা এই প্রকাশক বদলের জন্য আপনাদের কাছে অনুমতি চেয়েছিলেন। তো সেটার কি হলো?

প্রকাশক বদলের জন্য নয়, যে মূল প্রকাশক ছিলেন উনি পদত্যাগ করেছেন আমাদের এখানে ঘোষণাপত্র স্বাক্ষর করে। এরপর আরেকজন প্রকাশক হতে চেয়েছিলেন সেটা আমাদের প্রক্রিয়ায় পড়েনি বলে তার আবেদনটা নামঞ্জুর করা হয়েছে। কাজেই এখন আমার দেশ পত্রিকার কোনো প্রকাশক নেই।

আপনাদের পক্রিয়ায় পড়েনি মানে? মানে, নামঞ্জুরের প্রক্রিয়াটা যদি আমাদের একটু ব্যাখ্যা করেন ...
নামঞ্জুর করার পক্রিয়া হলো যে আমাদের যে আইনটা আছে, যে ছাপাখানা ও প্রকাশনা আইন অনুযায়ী আবেদন করেছিলেন, আবেদন করার পরে এটা আমরা তদন্তের জন্য পাঠাই, তদন্তে তার পক্ষে মতামত আসে নি। এই কারণে আমরা কোনো প্রকাশককে দিতে পারি নি যিনি আবেদন করেছিলেন। মাহমুদুর রহমান আবেদন করেছিলেন তাকে আমরা প্রকাশক নিযুক্ত করতে পারি নি।

কেন তাকে.... তার আবেদন নামঞ্জুর করা হলো? মানে তদন্তে কী সমস্যা পাওয়া গেছে সেটা কি তাকে জানিয়েছেন বা সেটা কি বলা যাবে?
আমরা অফিসে... আমরা অফিসিয়ালি চিঠি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছি। অনেকগুলো বিষয় উল্লেখ আছে। এতটা এই স্বল্প সময়ের ভিতরে বিস্তারিত বলা সম্ভব নয়।
এটা আপনারা কবে জানিয়ে দেন তাকে?
আমরা আজকে জানিয়েছি।’’

এত দীর্ঘ উদ্ধৃতি দেয়ার কারণ জেলা প্রশাসন এবং চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের সাথে যেসব আনুষ্ঠানিক পত্র বিনিময় হয়েছে দৈনিক আমার দেশের, সেই সব দলিলপত্র আমাদের কাছে আছে। অতএব সব পত্রিকাগুলোর কাছেও আছে। আছে সরকারের তরফ থেকে পাওয়া একমাত্র বক্তব্য­ এই সাক্ষাৎকারও। তাহলে এই সকল আইনি কেচ্ছা গাইবার কোনোই কারণ নাই। স্রেফ গায়ের জোরে, অসাংবিধানিক-অগণতান্ত্রিক ও আইনবহির্ভূতভাবে ফ্যাসিবাদী সরকার আমার দেশ বন্ধ করে দিয়েছে।

বিবিসি’র প্রথম প্রশ্নের উত্তরে জেলা প্রশাসক স্বীকার করে নিচ্ছেন যে, ‘এগারো দশ দুই হাজার নয় তারিখে’ অর্থাৎ ১১ অক্টোবর ২০০৯ তারিখে সাবেক প্রকাশক যথানিয়মে ইস্তফা দিয়েছেন। কিন্তু তিনি যা লুকাচ্ছেন তা হলো­ সাবেক প্রকাশকের এই ইস্তফার প্রায় দেড় মাস আগে­ ৩ সেপ্টেম্বর ২০০৯ তারিখে আমার দেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেড কর্তৃপক্ষ জেলা প্রশাসনকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি মারফত জানিয়েছেন যে, কম্পানি প্রকাশক পদে বদল করেছে এবং এ বিষয়ে প্রশাসনের অনাপত্তির জন্য আবেদন করেছে। আগের এই আবেদনের কথা তিনি লুকাচ্ছেন এবং ওই আবেদনের সপক্ষে সাবেক প্রকাশকের দেয়া ইস্তফার কথাই কেবল বলছেন। তথ্য চেপে যাওয়ার পরে জেলা প্রশাসক জনাব মহিবুল হক এবার সরাসরি মিথ্যা তথ্য দিচ্ছেন; চতুর্থ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলছেন যে, ‘তারা জানিয়েছে তাদের প্রকাশক নেই’। অথচ ১৫ মার্চ দেয়া জেলা প্রশাসনের চিঠির জবাবে পত্রিকাটি আনুষ্ঠানিকভাবে যে চিঠি দেয় সেখানে এমন কোনো কথা নাই। বরং সেই চিঠিতে পত্রিকা কর্তৃপক্ষ আবারো জেলা প্রশাসনকে মনে করিয়ে দিয়েছিল যে, ৩ সেপ্টেম্বর ২০০৯ তারিখে তাদের দেয়া প্রকাশক বদল-সংক্রান্ত চিঠির বিষয়ে প্রশাসন কিছুই না জানানোর কারণে, আইন অনুযায়ী তারা সাবেক প্রকাশকের নাম লিখছেন। একই সাথে পত্রিকাটি অনুরোধ জানিয়েছিল যাতে খুব তাড়াতাড়ি এ বিষয়ে প্রশাসন সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু প্রকাশকের এই বদলে আপত্তি নাকি অনাপত্তি দেবে সেই বিষয়ে জনাব মুহিবুল হকের জেলা প্রশাসন কোনো সিদ্ধান্ত নেয় নাই কিম্বা ১৫ মার্চের চিঠির জবাবের বিষয়েও কিছু জানায় নাই।

এবং অবশেষে বর্তমান সরকারের ঢাকা জেলা প্রশাসক সাহেব বললেন, ‘আমরা আজকে জানিয়েছি’। ‘আজকে’ মানে ১ জুন ২০১০ তারিখে। অর্থাৎ দাঙ্গা পুলিশ পাঠিয়ে পত্রিকার প্রেস বন্ধ করে দেয়া এবং কোনো গ্রেফতারি পরোয়ানা ছাড়া বেআইনিভাবে পত্রিকা অফিসে ঢুকে, সাংবাদিকদের পিটিয়ে পরে সম্পাদককে ধরে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে তারা জানালেন যে, ‘মাহমুদুর রহমান আবেদন করেছিলেন তাকে আমরা প্রকাশক নিযুক্ত করতে পারি নি।’ ‘অফিসিয়ালি’ কোনো চিঠি প্রশাসন পত্রিকা কর্তৃপক্ষকে পৌঁছায় নি। অর্থাৎ সরকারের উচ্চস্তর থেকে পাওয়া হুকুম তামিল করতে স্রেফ বন্দুক আর লাঠির জোরে বলা হলো যে, পত্রিকার প্রকাশক নাই!

জাতীয় সংসদে তথ্যমন্ত্রী ২ জুন জানিয়েছেন, ‘পত্রিকার ডিক্লারেশন বন্ধ করার দায়িত্ব ডিসির’। মন্ত্রী ঠিক বলেছেন। (এতটুকু বললে ঠিকই ছিল। উনিশ শো তিয়াত্তর সালের প্রিন্টিং প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স অ্যাক্ট অনুযায়ী ডিক্লারেশন ও রেজিস্ট্রেশনের দায়িত্ব ডিসি মানে ডেপুটি কমিশনার মানে জেলা প্রশাসকের ওপরেই বর্তায়। কিন্তু মন্ত্রী তার আগে বলেছেন, এই দায়িত্ব সরকারের না। তারপর বললেন দায়িত্ব ডিসির। মন্ত্রী কি কোনো বেসরকারি জেলা প্রশাসনের কথা জানেন নাকি? অথবা মন্ত্রী যদি ধরে নেন জেলা প্রশাসন সরকারের বাইরে তবে বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য সেটা ভয়ের কথা)। আইন অনুযায়ী পত্রিকার প্রকাশনার ঘোষণা মানে ডিক্লারেশনসহ ইত্যাদি তদারকির দায়িত্ব হচ্ছে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের।

কিন্তু প্রকাশক বদলের জন্য গত বছরের সেপ্টেম্বরে দৈনিক আমার দেশের করা আবেদনের প্রেক্ষিতে যখন চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর থেকে, গোয়েন্দা বিভাগ থেকে অনাপত্তি দেয়া হলো, তার পরও যখন ঢাকা জেলা প্রশাসন অনাপত্তি দিচ্ছিলো না, তখন পত্রিকাটির পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হলে প্রশাসন জানিয়েছিল বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বিবেচনাধীন আছে, সেখান থেকে ছাড় দেয়া হচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দৈনিকটির ওই আবেদন বিবেচনাধীন থাকার কথা ঢাকা জেলা প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা সংবাদমাধ্যমের কাছেও স্বীকার করেছেন, নাম প্রকাশ না করার শর্তে। তো, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কি ঢাকা জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব নিয়েছেন? তিনি কি এ দায়িত্ব সম্পাদনের নজির রাখা শুরু করলেন আমার দেশকে দিয়ে?
সারা দেশ এখন আদালতের ভূমিকার দিকে তাকিয়ে আছে। আশা করি আদালত ফ্যাসিবাদী সরকারকে সংবিধান ও আইনের মধ্যে উপযুক্ত জবাব দেবেন।
(সূত্র, নয়া দিগন্ত,০৪/০৬/১০)

Thursday, 3 June 2010

চ্যানেল ওয়ান বন্ধ করে দিয়েছে সরকার



28/04/2010

স্টাফ রিপোর্টার
জনপ্রিয় বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন কেন্দ্র চ্যানেল ওয়ান বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। ঠুনকো অজুহাতে গতকাল সন্ধ্যা ৬টা ৪১ মিনিটে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) কর্মকর্তারা চ্যানেলটির গুলশান অফিসে গিয়ে সম্প্রচার বন্ধ করে দেন। এতে সেখানে কর্মরত ৪০০ সাংবাদিক, কর্মচারী ও কলাকুশলী বেকার হয়ে পড়েছেন। বন্ধের কারণ হিসেবে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু বলেন, টেলিযোগাযোগ আইন লঙ্ঘন করে চ্যানেল ওয়ান তাদের সম্প্রচার যন্ত্রপাতি ব্যাংকে বন্ধক রেখে পরবর্তীকালে সেগুলো নিলামে বিক্রি করে দেয়ার প্রেক্ষিতে সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে চ্যানেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলেছেন, ভিন্নমত দলন ও কণ্ঠরোধের অংশ হিসেবে চ্যানেলটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বেশ কিছুদিন ধরে চ্যানেলের সংবাদ ও টকশো’র ব্যাপারে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছিল বলেও জানা গেছে। শেষ পর্যন্ত সরকারের রোষানলে পড়ে টিভি পর্দা থেকে হারিয়ে গেল চ্যানেলটি। চ্যানেলের অন্যতম পরিচালক মাজেদুল ইসলাম বলেছেন, তারা এখন আইনের আশ্রয় নেবেন।
গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় যথারীতি বুলেটিন প্রচার করছিল চ্যানেল ওয়ান। ওই সময়ই বিটিআরসির কর্মকর্তারা গুলশানের উদয় টাওয়ারে অবস্থিত চ্যানেলটির অফিসে ঢোকেন। বুলেটিনটি শেষ করতেও দেয়া হয়নি। তার আগেই সংবাদ পাঠককে চ্যানেল বন্ধের ঘোষণা দিতে হয়। বুলেটিনের মাঝখানেই প্রায় বাকরুদ্ধ কণ্ঠে খবর পাঠক শামীম মাহবুব বলেন, ‘প্রিয় দর্শক সম্ভাবনার কথা বলে’—এ স্লোগানে আধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে ২০০৬ সালের ২৪ জানুয়ারি যাত্রা শুরু করে স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল ওয়ান। দীর্ঘ পথপরিক্রমায় এরই মধ্যে দেশ-বিদেশে দর্শকদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে চ্যানেলটি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি, ‘বিটিআরসির নির্দেশে এখন থেকে চ্যানেল ওয়ানের সম্প্রচার সাময়িকভাবে বন্ধ হচ্ছে। এজন্য চ্যানেল ওয়ানের সব দর্শক, কেবল অপারেটর, কলাকুশলী ও বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত। আশা করি খুব শিগগিরই আমরা আবারও আমাদের সংবাদ এবং অনুষ্ঠান নিয়ে ফিরে আসব আপনাদের মাঝে।’
গতকাল সন্ধ্যায় চ্যানেল ওয়ান বন্ধ করে দেয়ার জন্য বিটিআরসি কর্মকর্তারা যাওয়ার আগে প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে চ্যানেল ওয়ান পরিচালনাকারী কোম্পানি ওয়ান এন্টারটেইনমেন্ট টেলিভিশনের পরিচালক মাজেদুল ইসলাম বলেন, বিটিআরসি যে ক’টি শোকজ নোটিশ চ্যানেল ওয়ানকে পাঠিয়েছে, তার সবক’টির যথাযথ উত্তর দেয়া হয়েছে। চ্যানেল ওয়ানের বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, প্রয়োজনে সরকারের সব কথা আমরা মেনে চলব। তিনি বলেন, চ্যানেল ওয়ানের সম্প্রচারযন্ত্র নিলামে বিক্রি হয়েছে কিনা সে বিষয়ে প্রাইম ব্যাংক কোনো নোটিশ পাঠায়নি। যন্ত্রপাতি নিলাম হওয়ার পর ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করে চ্যানেল ওয়ান। পরে হাইকোর্ট রায় দেন যন্ত্রপাতি নিলামে বিক্রি করা যাবে। এরপর ব্যাংক নিলামে যন্ত্রপাতি বিক্রি করে। তবে তারা বলেছে, লেনদেন পুরোপুরি না হওয়ায় যন্ত্রপাতি হ্যান্ডওভার করা হয়নি। এ বিষয়ে বিটিআরসি জানতে চাইলে তাদের কাছে পরিষ্কার ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে টেলিভিশনের বার্তা প্রধান রাশিদ-উন নবী বাবুও উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত চ্যানেল ওয়ানের শতাধিক কর্মীর চোখে ছিল জল। টেলিভিশনটির বিশেষ সংবাদদাতা কেরামতউল্লাহ বিপ্লব চ্যালেন ওয়ানের কর্মীদের পক্ষে বক্তব্য দেয়ার সময় বলেন, প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে ৪০০ কর্মী দিশাহারা হয়ে যাবে। তারা কী খাবে, তাদের সংসার কিভাবে চলবে তা অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘চ্যানেল ওয়ানের বিষয়ে কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, তথ্যমন্ত্রী, বিটিআরসি মানবিক দিকটি বিবেচনা করবেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ভিন্নমতের আরও একাধিক চ্যানেলের ওপর সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে একই ধরনের চাপ ও হুশিয়ারি রয়েছে বলেও জানা গেছে। এর আগে বিগত জরুরি সরকারের সময়ে বন্ধ করে দেয়া হয় আরেক জনপ্রিয় স্যাটেলাইট চ্যানেল সিএসবি। অবশ্য গত বিএনপি সরকারের আমলে সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে একুশে টেলিভিশনের সম্প্রচারও বন্ধ হয়েছিল। বর্তমান সরকারের আমলে যমুনা টেলিভিশন আনুষ্ঠানিকভাবে সম্প্রচারে যাওয়ার আগেই তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়।
মন্ত্রীই প্রথম জানালেন চ্যানেল বন্ধের সিদ্ধান্তের কথা : গতকাল সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে জাতীয় টেলিকম দিবস উদযাপনের প্রস্তুতি সভার পর ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু সাংবাদিকদের চ্যানেল ওয়ান বন্ধ করে দেয়া হবে বলে জানান। তারপর থেকেই ‘চ্যানেল ওয়ান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে’ এ ধরনের খবর ছড়িয়ে পড়ে। অন্যান্য টেলিভিশন চ্যানেলে ব্রেকিং নিউজ হিসেবে প্রচার করা হয় ‘চ্যানেল ওয়ান যে কোনো সময় বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে’। এতে হতবিহবল হয়ে পড়ে চ্যানেল ওয়ান কর্মীরা। মালিকানা বিবেচনা করে চ্যানেল ওয়ান বন্ধ করা হচ্ছে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে টেলিযোগাযোগমন্ত্রী বলেন, এখানে মালিকানার কোনো বিষয় নেই। আর হুট করেই চ্যানেল বন্ধ করার সিদ্ধান্ত হয়নি। দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মন্ত্রী বলেন, মালিক দেখে চ্যানেল বন্ধ করা হলে আরও অনেক চ্যানেল বন্ধ করতে হয়। প্রসঙ্গত, চ্যানেল ওয়ানের অন্যতম মালিক ব্যবসায়ী গিয়াসউদ্দিন আল মামুন। মন্ত্রী বলেন, তাদের টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স কেন বাতিল করা হবে না তা জানতে চেয়ে তিন মাস আগে চ্যানেল ওয়ান কর্তৃপক্ষকে নোটিশও দেয়া হয়। কিন্তু চ্যানেল ওয়ান কর্তৃপক্ষ ওই নোটিশের সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেনি। আর সে কারণেই চ্যানেলটি বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বর্তমানে অন্য প্রতিষ্ঠানের নামে আমদানি করা যন্ত্র দিয়ে চ্যানেল ওয়ান চলছে বলে জানান তিনি। মন্ত্রী বলেন, এ অবস্থায় সরকার এ প্রতিষ্ঠানটিকে চলতে দিতে পারে না। তারা যে অপরাধ করেছে, তার শাস্তি হচ্ছে চ্যানেলটি বন্ধ করে দেয়া। এ সময় বিটিআরসি চেয়ারম্যান জিয়াউদ্দীন আহমেদ বলেন, চ্যানেলটি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকার একটি ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
চ্যানেল ওয়ানের একটি সূত্র জানায়, গতকাল সকালে তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে ফোন করে তাদের জানানো হয়, চ্যানেল ওয়ান বন্ধ করে দেয়া হবে। বন্ধের সময় তারা যেন কোনো ধরনের ঝামেলা না করেন। তবে তথ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (সম্প্রচার) আমিনুল ইসলাম জানান, এ বিষয়টি বিটিআরসির অধীনে। চ্যানেল ওয়ান বন্ধের ব্যাপারে তিনি কিছু জানেন না। তবে তিনি বলেন, চ্যানেল ওয়ানের মালিকানা, ব্যাংকঋণ ও যন্ত্রপাতি ক্রয় সংক্রান্ত বেশ কিছু জটিলতা রয়েছে।
উল্লেখ্য, দেশে এ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যতবার এসেছে ততবারই বিভিন্ন সংবাদ প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়েছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী আওয়ামী লীগের প্রথম শাসনামলে সরকারি নিয়ন্ত্রণে ৪টি সংবাদপত্র রেখে অন্যসব সংবাদপত্র বন্ধ করে দেয়া হয়। বেকার হয়ে পড়েন শত শত সাংবাদিক। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে দৈনিক বাংলা, বাংলাদেশ টাইমস, বিচিত্রা ও আনন্দ বিচিত্রা বন্ধ করে দিয়ে কয়েকশ’ সাংবাদিককে বেকারত্বের মুখে ঠেলে দেয়া হয়।
সংবাদ কর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ, ক্ষোভ ও হতাশা : চ্যানেল ওয়ান বন্ধ করে দেয়ায় চ্যানেলটির কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সংবাদকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ, ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। চ্যানেলটির নিউজ এডিটর ফাহিম আহমেদ তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েই এটা বন্ধ করেছে। এতে চার-পাঁচশ’ পেশাদার সাংবাদিক-কর্মচারী-কর্মকর্তা বেকার হলেন। অনেকের জীবন অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে গেল। হয়তো অনেককে পরিবার-পরিজন নিয়ে এখন খেয়ে না খেয়ে কাটাতে হবে নতুন চাকরি পাওয়ার আগ পর্যন্ত। তিনি বলেন, চ্যানেল ওয়ানের সাংবাদিক-কর্মচারীরা তাদের বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন।
সম্প্রচার বন্ধের ব্যাপারে জানতে চাইলে চানেল ওয়ানের চিফ রিপোর্টার মোস্তফা আকমল অত্যন্ত আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, আমি প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে শুরু থেকেই জড়িত। এমন একটি জনপ্রিয় চ্যানেল যন্ত্রপাতি বিক্রির অজুহাতে বন্ধ করে দিলে এর সঙ্গে জড়িত সাংবাদিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কী হবে সরকার কী তা একবার ভেবে দেখেছে? তিনি জানান, টেলিযোগাযোগমন্ত্রী সকালে বলেছেন চ্যানেল ওয়ান একটি পরিচ্ছন্ন বিনোদনমূলক নিরপেক্ষ চ্যানেল। যদি তাই হয় তাহলে এমন একটি চ্যানেল বন্ধ করার কী যৌক্তিকতা আছে? তিনি বলেন, চ্যানেল ওয়ান বন্ধ করে দেয়ায় এখানে কর্মরত সবাই একেবারে ভেঙে পড়েছেন। এখানে প্রায় চার-পাঁচশ’ সাংবাদিক-কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করছিলেন। তাদের পরিবার মিলে এই মিডিয়ার সঙ্গে জড়িত প্রায় দশ হাজার লোক। সরকার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার প্রতিশ্রুতি দিয়েই ক্ষমতায় এসেছে। তাদের কাছে আমাদের দাবি, ভুল যদি হয়েও থাকে তাহলে তার জন্য দায়ী মালিকপক্ষ। কোনোভাবেই স্টাফরা নন। সমস্যা হলে সমাধানও আছে। কিন্তু চ্যানেল বন্ধ করে দিয়ে সমাধান খোঁজা ঠিক হবে না। তিনি বলেন, আমরা বিটিআরসি কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি, মালিকপক্ষের কোনো ভুল থাকলে প্রশাসক নিয়োগ করুন। নতুবা আপনারা চালান। তবু চ্যানেলটি বন্ধ করবেন না।
স্পোর্টস এডিটর পরাগ আরমান ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, সব শেষ হয়ে যাওয়ার পর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে কি লাভ। প্রেজেন্টার কাম নিউজরুম এডিটর শবনম নূপুর বলেন, ভীষণ খারাপ লাগছে। এটা যে আবার কবে চালু হবে তা জানি না। নেটওয়ার্ক ইনচার্জ মনিরা তানভীন টুলি চ্যানেল ওয়ান বন্ধের ঘোষণা শুনে প্রায় কেঁদেই ফেলেন। তিনি বলেন, অসুস্থ হয়ে ক’দিন বাসায় ছিলাম। বাসায় বসেই টিভিতে ঘোষণাটি শুনলাম। চ্যানেল বন্ধের এই ঘোষণাটি আমার কাছে বিনামেঘে বজ্রপাতের মতো মনে হয়েছে। তিনি বলেন, চ্যানেল ওয়ানের সাংবাদিক ও স্টাফদের অবস্থা খুবই খারাপ। তারা বিশ্বাসই করতে পারছেন না তাদের প্রিয় চ্যানেলটি বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি সরকারের কাছে আহ্বান জানান, সমস্যা সমাধান করে তাড়াতাড়ি যেন এই চ্যানেলটি খুলে দেয়া হয়।

http://www.amardeshonline.com/pages/details/2010/04/28/29513

দুদক এবার সরাসরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে


27/04/2010
জাহেদ চৌধুরী
দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) রাষ্ট্রপতির কাছে জবাবদিহি করা, মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে সরকারের অনুমতি, সিনিয়র সরকারি কর্মকর্তাদের জুনিয়র কর্মকর্তা দিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ না করা, মিথ্যা অভিযোগ করলে অভিযোগকারীকে ৫ বছরের জেল-জরিমানার বিধানসহ দুদক আইনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। এছাড়া খসড়া আইনে সরকারের পক্ষ থেকে কমিশনের সচিব নিয়োগ করা, সরকারের সম্মতি ছাড়া কোনো সংস্থার সঙ্গে কমিশনের চুক্তি করতে না পারা, জাতীয় স্বার্থে করদাতাদের তথ্য গোপন রাখা, কমিশনের পাশাপাশি পুলিশের মাধ্যমে তদন্ত করা, যে কোন মামলার তদন্ত কাজ ৬০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করা ইত্যাদি প্রস্তাবও করা হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গতকাল সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে দুর্নীতি দমন কমিশন সংশোধন আইন-২০০৪-এর খসড়া নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়। মন্ত্রিসভায় নীতিগত অনুমোদিত দুদক আইনের পরিবর্তন সাস্প্রতিক সময়ে সরকারের প্রচ্ছন্ন নিয়ন্ত্রণে থাকা ‘স্বাধীন’ দুর্নীতি দমন কমিশনকে এবার সরাসরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেবে বলে দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন। প্রতিষ্ঠান হিসেবে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে সক্রিয় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআইবি) তাদের তাত্ক্ষণিক আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় অভিন্ন অভিমত দিয়েছে।
গতকাল আমার দেশ-এর কাছে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় টিআইবি’র সাবেক সভাপতি, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর বর্তমান সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ শিক্ষক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. তালুকদার মনিরুজ্জামান, টিআইবি’র বর্তমান চেয়ারম্যান ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আরেক সাবেক উপদেষ্টা এএসএম শাহজাহান সরকারি সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রায় অভিন্ন অভিমতে বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির কাছে জবাবদিহি আর প্রধানমন্ত্রী কিংবা সরকারের কাছে জবাবদিহি একই কথা। মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে দুদককে সরকারের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে আগের দুর্নীতি দমন ব্যুরোর মতো অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করবে। এই সিদ্ধান্ত সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সম্পূর্ণ বিপরীত।
আর দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমানের কাছে গতরাতে টেলিফোনে এ ব্যাপারে আমার দেশ-এর পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি হতাশা ব্যক্ত করে কিছু মন্তব্য করেন। তবে তিনি বলেন, এ মুহূর্তে আমার বক্তব্য হিসেবে আপনারা লিখতে পারেন। মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তগুলো আমি পুঙ্খানুপুঙ্খ দেখে আমার আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাব। তবে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের পর বিকালে ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, দেশ চালানোর দায়িত্ব জনগণ দুদককে দেয়নি। দায়িত্ব দেয়া হয়েছে সরকার ও সংসদকে। সংসদ যেভাবে আইন প্রণয়ন করবে দুদক সে পরিধির মধ্য থেকে দায়িত্ব পালন করবে। তবে শেষ পর্যন্ত যা হবে তা সবার মঙ্গলের জন্যই হবে বলে আশা করি। দেশে দুর্নীতি বাড়ুক তা সরকার, সংসদ, জনগণ কেউই চায় না। দুর্নীতি উত্সাহিত হয় দুদক আইনে এমন কোনো সংশোধনী সংসদে পাস হবে বলে আমি এখনও বিশ্বাস করি না। তিনি বলেন, সরকার চাইলে দুদক স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে। এজন্য আইন কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদের কাছে টেলিফোনে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিবের আনুষ্ঠানিক ব্রিফিংয়ের বাইরে এ নিয়ে আমি আর কিছু বলতে চাই না।
এর আগে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ সাংবাদিকদের জানান, খসড়া আইনে দুর্নীতি দমন কমিশনে কেউ মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করলে তার বিরুদ্ধে ৫ বছরের জেল ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। তিনি জানান, অভিযোগ তদন্তের স্বার্থে দুর্নীতি দমন কমিশন সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও অধীন কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের সহায়তা চাইতে পারবে।
কমিশনকে তার কাজের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে জবাবদিহি করতে হবে কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাব তিনি এড়িয়ে যান। তবে বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশনকে কার্যকর ও জবাবদিহি করতে সরকার এ সংশোধনী এনেছে। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তার সরকার স্বাধীন, কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক কমিশন প্রতিষ্ঠা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তবে বৈঠকে উপস্থিত একাধিক মন্ত্রী সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জবাবদিহি করার বিধানসহ এর আগে গঠিত কেবিনেট কমিটির সুপারিশের আলোকেই মন্ত্রিসভায় দুদক আইনের সংশোধনী আনা হয়েছে। এর আগে কেবিনেট কমিটির সুপারিশকৃত সংশোধনীর ব্যাপারেই দুদক চেয়ারম্যান তার আপত্তির কথা জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে বলেছিলেন, দুদক এমনিতেই একটি দন্তহীন বাঘ। এখন এর নখগুলোও কেটে নেয়ার চেষ্টা হচ্ছে। আর সম্প্রতি আমার দেশ-এর সঙ্গে বিশেষ সাক্ষাত্কারে সরকারি দলের নেতাদের দুর্নীতির ব্যাপারে তার মন্তব্য ছিল, ‘সরকারের কারও বিরুদ্ধে হুট করে কিছু করা ঠিক হবে না।’ ২০০৪ সালে দুদক আইনে জরুরি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বেশকিছু সংশোধনী এনে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। বর্তমান সরকার সেগুলো পাস না করে আইনটি পর্যালোচনার জন্য মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করে ওই কমিটি ১৯ দফা সুপারিশ করেছিল। যার ৯টিতেই দুদক আপত্তি জানিয়েছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আপত্তি ছিল রাষ্ট্রপতির কাছে জবাবদিহি করা এবং সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত পরিচালনার আগে সরকারের কাছ থেকে অনুমতি গ্রহণ।
সূত্র অনুযায়ী, গতকাল মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দুদক স্বাধীন সংস্থা হিসেবে কাজ করবে আমরা চাই। এটি আরও শক্তিশালী ও কার্যকর হবে সেটাও আমরা চাই। তবে স্বাধীনতা মানে এই নয়, তারা ইচ্ছা-খুশিমত চলবে। তাদের একটি কন্ট্রোলিং অথরিটি থাকা উচিত। দুদক রাষ্ট্রপতির কাছে জবাবদিহি করতে চায় না, সংসদ, জনগণ কারও কাছে জবাবদিহি করবে না, তবে কি শুধু আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করবে—এমন মন্তব্যও মন্ত্রিসভায় করা হয়েছে। দুদক যে স্বাধীনতা চায় সেটা দেয়া হলে দেশের মধ্যে আরেক স্বাধীন দেশ হয়ে যাবে বলেও মন্ত্রিসভায় মন্তব্য করা হয়েছে বলে উপস্থিত একটি সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে দুদকের শীর্ষ পর্যায় থেকে বলা হয়েছে, জুনিয়র কর্মকর্তারা সিনিয়র কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে না পারলে দুদকে মন্ত্রী, সচিব নিয়োগ দিতে হবে। নিয়োগকারী হিসেবে রাষ্ট্রপতির কাছে দুদক তার প্রতিবেদন দাখিল করে থাকে। তবে আইনের মধ্যে এটাকে অন্তর্ভুক্ত করায় ভিন্ন অর্থ দাঁড়াবে। আইন ও বিচার ব্যবস্থার কাছে দুদকের এক ধরনের জবাবদিহিতা আছে। কারণ দুদক নিজে কোনো বিচার করে না। তদন্ত এবং প্রসিকিউটরের কাজ করে। এ অবস্থায় দুদকের জবাবদিহিতার প্রশ্ন কেন আসছে তা বোধগম্য নয়। মিথ্যা অভিযোগের ব্যাপারে শাস্তির কথা বলা হয়েছে। যার ফলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযোগ আসবে না। পত্রিকায়ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে খবর কমে যেতে পারে। কমিশনের শীর্ষ পর্যায় থেকে আরো বলা হয়েছে, দুর্নীতির বিশেষ করে সম্পদের হিসাব অনুসন্ধানে ব্যাংক এবং আয়কর বিভাগ আইনগত বাধা দেখিয়ে তথ্য দিতে চায় না। মানি লন্ডারিং আইনের মতো দুদক আইনেও অন্য আইনের ওপরে এর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
দুদক আইন সংশোধনে টিআইবি’র উদ্বেগ : দুর্নীতি দমন কমিশন আইন সংশোধনে মন্ত্রিপরিষদে গতকাল গৃহীত সিদ্ধান্তে তাত্ক্ষণিকভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। এতে বলা হয়, সরকারের দুদক আইন সংশোধন কমিটির প্রস্তাবিত সুপারিশ অনুমোদিত হলে দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা খর্ব ও অকার্যকর হবে বলে মনে করে টিআইবি। তাছাড়া সরকার কর্তৃক গঠিত দুদক আইন সংশোধন কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী দুদককে রাষ্ট্রপতির কাছে তাদের কার্যাবলির জন্য দায়বদ্ধ রাখার যে বিধান সংযোজন করা হয়েছে তাতে দুদক রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করার সুযোগ হারাবে। কারণ রাষ্ট্রপতি শুধু প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি ছাড়া অন্য সব ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকেন। এর পরিবর্তে দুদকের দায়বদ্ধতা জাতীয় সংসদের একটি বিশেষ কমিটির ওপর ন্যস্ত হতে পারে যাতে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব রাজনৈতিক দলের সমসংখ্যক প্রতিনিধিত্ব থাকবে— বলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। টিআইবি জাতীয় সংসদের সম্মানিত সদস্যদের প্রতি দাবি জানিয়েছে যেন প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের আলোকে বস্তুনিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণ করে এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ মহলের পরামর্শক্রমে যথোপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
টিআইবি বলেছে, সরকারি কর্মকর্তাদের সম্ভাব্য দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে পূর্বঅনুমতি গ্রহণের বাধ্যবাধকতা শুধু দুদকের কর্মক্ষমতা সংকুচিত করবে তা-ই নয়, বাস্তবিকপক্ষে দেশের সব নাগরিকের সমান অধিকারের যে সাংবিধানিক বিধান, তারও লঙ্ঘন হবে। কমিশনের সচিবের নিয়োগের ক্ষমতা সরকারের হাতে অর্পিত হলে কমিশন প্রশাসনের প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হবে। একইসঙ্গে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় অন্যতম সহায়ক প্রতিষ্ঠান হিসেবে জবাবদিহিমূলক ও স্বচ্ছ শাসন ব্যবস্থাসহ গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে এর স্বাধীনতা নিশ্চিত করে একে শক্তিশালী করার পক্ষে বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা’ বিষয়ক দ্বিতীয় অগ্রাধিকারভিত্তিক অঙ্গীকারের যথার্থতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
জনগণের প্রত্যাশা একটি স্বাধীন ও কার্যকর দুদক। বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রীসহ অন্যান্য মন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে তাদের বক্তব্যে দুদকের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। সরকারের সদিচ্ছা এবং জোরালো সমর্থন ছাড়া দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়া এবং দুদককে কার্যকর করা কোনোমতেই সম্ভব নয়। সরকারের দুদক আইন সংশোধন কমিটির প্রস্তাবিত সুপারিশ যাচাই সাপেক্ষে সংসদ সদস্যরা এটি পাস করবেন বলে টিআইবির বিশ্বাস।
বিশিষ্টজনদের প্রতিক্রিয়া : অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ বলেছেন, রাষ্ট্রপতির কাছে জবাবদিহিতা মানে সরকার তথা প্রধানমন্ত্রীর কাছে জবাবদিহিতা এবং দুদককে সরকারি অনুমতি নিয়ে মামলা করতে গেলে আর তাদের স্বাধীনতা থাকে না। অতীতের দুর্নীতি দমন ব্যুরোর মতো তারাও এখন অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। জাতিসংঘের কনভেনশন অনুযায়ী দুর্নীতির তথ্যদাতাকে প্রটেকশন দেয়ার আইন সরকারের করা উচিত, সেটা না করে তাদের শাস্তি দেয়ার ব্যবস্থা তারা করছে। অভিযোগের সত্য-মিথ্যা যাচাই করার দায়িত্ব দুদকের, সেটা তারা করবে। সরকারের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত দুদককে দুর্বল করবে। সরকারের কর্মকাণ্ড আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ।
টিআইবি চেয়ারম্যান এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেছেন, সরকারি সিদ্ধান্তে কমিশন প্রায় অকার্যকর ও দুর্বল হয়ে পড়বে। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, এমপি কিংবা সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ বিভিন্ন সময় এসেছে। সেগুলো তদন্ত করতে অনুমতি লাগবে। দুদক আর কাজ করতে পারবে না। সরকারের উচিত ছিল দুদকের যেসব আইনি বাধা রয়েছে সেগুলো দূর করে তাদের স্বাধীন ও শক্তিশালী হয়ে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করা। কিন্তু সেটা না করে তারা ঠিক উল্টোটি করেছে।
বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. তালুকদার মনিরুজ্জামান বলেছেন, এটা হলে দুদকের স্বাধীনতা খর্ব হবে। দুদক আর আগের দুর্নীতি দমন ব্যুরোর মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না। এ প্রতিষ্ঠানটি সরকারের আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এএসএম শাহজাহান বলেছেন, দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা খর্ব হলে দেশের গণতন্ত্র ও সুশাসন হুমকির মধ্যে পড়বে। সরকারের উচিত হবে দুদকের ক্ষমতা খর্ব না করে একে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়া এবং এর সমস্যাগুলো দূর করার উদ্যোগ নেয়া।
আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদের কাছে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত ও দুদককে তার কর্মকাণ্ডের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে জবাবদিহি করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ নিয়ে আমি কোনো মন্তব্য করব না।
নির্বাচনী অঙ্গীকারে যা ছিল : আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের ৫টি অগ্রাধিকারের ২ নম্বর অনুচ্ছেদে বলেছিল : “২. দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা : দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে শক্তিশালী করা হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে বহুমুখী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। ক্ষমতাধরদের বার্ষিক সম্পদ বিবরণ দিতে হবে। রাষ্ট্র ও সমাজের সকল স্তরের ঘুষ, দুর্নীতি উচ্ছেদ, অনোপার্জিত আয়, ঋণখেলাপি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, কালোটাকা ও পেশীশক্তি প্রতিরোধ ও নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রতি দফতরে গণঅধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নাগরিক সনদ উপস্থাপন করা হবে। সরকারি কর্মকাণ্ডের ব্যাপকভাবে কম্পিউটারায়ন করে দুর্নীতির পথ বন্ধ করা হবে।” এ বিষয়ে তাদের ইশতেহারের ভিশন অংশের ৫ নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে : “দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন : স্বাধীন ও শক্তিশালী দুর্নীতি দমন কমিশনসহ দুর্নীতি দমনে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকে আরো কার্যকর করে গড়ে তোলা হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। নাগরিক অধিকার সনদ রচনা, তথ্য অধিকার নিশ্চিত করা এবং সরকারি দলিল দস্তাবেজ কম্পিউটারায়ন এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রায়ন, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে দুর্নীতির পথগুলো সম্ভাব্য সকল উপায়ে বন্ধ করা হবে।”
কিন্তু গতকাল মন্ত্রিসভায় যেভাবে দুদক আইনে সংশোধনী আনা হয়েছে তাতে তাদের নির্বাচনী অঙ্গীকারের সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্রই ফুটে উঠেছে।

http://www.amardeshonline.com/pages/details/2010/04/27/29362