Saturday, 24 September 2011

মন্তব্য প্রতিবেদন : দেশপ্রেমিক হলে দেশের স্বার্থ দেখুন



মাহমুদুর রহমান
কাল ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং তার দেশের মন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী এবং প্রভাবশালী আমলাদের এক বিরাট দল নিয়ে বাংলাদেশ সফরে আসছেন। সেই সফরসঙ্গীদের মধ্যে বাংলাদেশসংলগ্ন রাজ্যগুলোসহ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাঁচ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরাও রয়েছেন। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর এই অতীব গুরুত্বপূর্ণ সফরকে উপলক্ষ করেই সাপ্তাহিক লেখাটা বুধবারের পরিবর্তে দু’দিন এগিয়ে আনতে হলো। দেশের দীর্ঘমেয়াদি অনিষ্ট হয়ে যাওয়ার আগে ক্ষমতাসীন নীতিনির্ধারকসহ দেশবাসীর চৈতন্যোদয়ের সর্বশেষ ব্যক্তিগত, ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা হিসেবেই আমার আজকের মন্তব্য প্রতিবেদন।
শক্তিধর ও আগ্রাসী প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সরকার প্রধানের এই সফর নিয়ে বাংলাদেশের সরকারি মহলে অনেক দিন ধরেই সাজ সাজ রব চলছে। এ দেশের ভারতপ্রেমীরাও তাদের আরাধ্য দেবতাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য ব্যাকুলচিত্তে অপেক্ষমাণ। এই সফরে বাংলাদেশ কী কী অর্জন করবে, তার বায়বীয় হিসাবও আগ বাড়িয়ে পরজীবী সুশীল (?)রা করে চলেছেন।
ট্রানজিটের মোড়কে ভারতকে করিডোর দেয়ার বিনিময়ে বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুর বানানোর আষাঢ়ে গল্প এই চিহ্নিত গোষ্ঠী বিগত প্রায় দুই দশক ধরে ফেরি করে কার্যোদ্ধারের পর ইদানীং পিঠ বাঁচানোর জন্য কিছুটা ভিন্ন সুরে গান গাইছেন। বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যকার বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক সমস্যা নিয়ে লেখার আগে সোজাসাপটা বলে রাখছি, ভারতের প্রধানমন্ত্রী দিতে নয়, তিনি বাংলাদেশ থেকে নিতে আসছেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এক ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করা ছাড়া সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই পূর্ববঙ্গের জনগোষ্ঠীকে ওরা কখনও কিছু দেয়নি।
মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা প্রদানের পেছনেও তাদের রাজনৈতিক, সামরিক এবং অর্থনৈতিক স্বার্থচিন্তা কাজ করেছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে পূর্ববঙ্গের সম্পদে লুটেরা সাম্রাজ্যবাদীদের রাজধানী কলকাতার শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছে। প্রধানত, উচ্চবর্ণের হিন্দু জমিদারশ্রেণী এপার থেকে কৃষকের হাড়-মাংস নিংড়ে খাজনা আদায় করে ওপারে প্রাসাদ নির্মাণ করেছেন, বাবু সংস্কৃতির ধ্বজা উড়িয়েছেন। তত্কালীন পূর্ববঙ্গকে মূলত, কাঁচামাল এবং খাদ্যশস্য সরবরাহকারী হিন্টারল্যান্ড (hinterland) বা পশ্চাত্প্রদেশ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। পূর্ববঙ্গের দরিদ্র কৃষকের সন্তানরা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ার ন্যূনতম সুযোগও যাতে না পায়, সেই লক্ষ্যে আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা, নোবেল বিজয়ী বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ কলকাতার ব্রাহ্মণ বাবু সমাজ তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠারও ঘোরতর বিরোধিতা করেছিলেন।
পাকিস্তান আমলে গঙ্গার জলপ্রবাহ আটকে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান এবং আজকের বাংলাদেশকে ক্রমশঃ মরুকরণ প্রক্রিয়ার দিকে ঠেলে দেয়ার জন্য। ১৯৪৭ পরবর্তী পূর্ব পাকিস্তানে আমদানি-রফতানির সুবিধার্থে ভারত সরকারের কাছে সাময়িকভাবে কলকাতা বন্দর ব্যবহারের প্রস্তাব করলে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু অবজ্ঞাভরে সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন,
"It is a strange demand from a peculiar country. A passage to go to their own country through a foreign country, it is unprecedented." (এটা এক অদ্ভুত রাষ্ট্রের আজব দাবি। একটি বিদেশি রাষ্ট্রের ভেতর দিয়ে তাদের দেশে যাওয়ার জন্য পথ, এটা নজিরবিহীন।)
আজ সেই পণ্ডিত নেহরুর বর্তমান প্রজন্ম বাংলাদেশের কাছে একাধিক চিরস্থায়ী করিডোর প্রাপ্তির আজবতর দাবি করতে এতটুকু লজ্জাবোধ করছে না, এটাই আশ্চর্য!
বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত মাত্র ক’দিন আগে আমরা যারা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্কিত স্বার্থ বিকিয়ে ভারতকে ট্রানজিট দেয়ার সাধ্যমত বিরোধিতা করছি, তাদেরকে ‘কাণ্ডজ্ঞানহীন’ বলে গাল দিয়েছেন। ভারতের সঙ্গে আগামী দু’দিনের আনুষ্ঠানিক আলোচনায় ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর মুখের সামনে পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুকে তার উদ্ধৃত বক্তব্যের জন্য একইভাবে কাণ্ডজ্ঞানহীন বলতে পারলে আমরা অবশ্যই বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রীর নৈতিক দৃঢ়তা ও সাহসের প্রশংসা করব। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমানের সম্মতিতে ফারাক্কা বাঁধ চালু করে বিগত তিন যুগে এ দেশের এক-তৃতীয়াংশ অংশকে প্রায় শুষ্ক করে ফেলেছে পরম ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ ভারত। সত্তরের দশকে চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলের সশস্ত্র বিদ্রোহীদের অর্থ, অস্ত্র এবং প্রশিক্ষণ দিয়ে মহান প্রতিবেশী ভারত তথাকথিত ‘শান্তি বাহিনী’ তৈরি করেছিল ওই অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদ ও সন্ত্রাস উসকে দেয়ার জন্য। ভারত সরকার প্ররোচিত এবং পরিচালিত সেই সন্ত্রাসী তত্পরতায় বাংলাদেশের কত বাঙালি ও পাহাড়ি বেসামরিক নাগরিক এবং আমাদের সেনাবাহিনীর কত সদস্যের প্রাণ গেছে, তার হিসাব আমরা ক’জনই বা রাখি!
শেখ হাসিনার আগের আমলে ত্রিপক্ষীয় শান্তিচুক্তি সম্পাদনের পর পার্বত্য চট্টগ্রামে হত্যাকাণ্ড কমে এলেও ভারতীয় বাহিনী কর্তৃক অন্যান্য সীমান্ত অঞ্চলে অসহায় বাংলাদেশী নাগরিক হত্যা আগের মতোই সমানতালে চলছে। গুলি করে, পিটিয়ে, তীর ও পাথর ছুঁড়ে অথবা বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে সপ্তাহে গড়ে অন্তত দু’জন বাংলাদেশী নাগরিককে হত্যা করছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ। ফারাক্কা ও গজলডোবা বাঁধের পর এবার সিলেট সীমান্তের ওপারে টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের তোড়জোড় চলছে বাংলাদেশের অপর এক-তৃতীয়াংশ অঞ্চলকে মরুভূমিতে পরিণত করার উদ্দেশ্যে। একই অঞ্চলে সারি নদীর (ভারতে মাইনথ্রু নদী) উজানে বাঁধ দিয়ে জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জের পরিবেশকে ধ্বংস করার প্রক্রিয়া সমাপ্ত করা হয়েছে। গত তিন যুগে পদ্মা বেসিন শুকিয়ে যাওয়ার পর আগামী তিরিশ বছরে মেঘনা বেসিনের জন্যও একই পরিণতি অপেক্ষা করছে। এদিকে তিস্তা নদীর পানিচুক্তি নিয়েও প্রতিদিন পরস্পরবিরোধী খবর শুনতে পাচ্ছি।
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এমন প্রেক্ষাপটেই কাল বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখছেন আমাদের সম্মানিত অতিথি ড. মনমোহন সিং। ২০১০ সালের মার্চে ভারত সফরে গিয়ে সে দেশের প্রতি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং দলীয় ঋণ পরিশোধের লক্ষ্যে যে একতরফা চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করে এসেছেন, সেগুলোকে পাকাপোক্ত করে দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য করার জন্যই ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশে আগমন। এই কঠিন বাস্তবতা উপলব্ধি করে আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হলে তার প্রতিফল প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাংলাদেশের নাগরিকদের ভোগ করতে হবে। গত পাঁচ বছর ধরে বাংলাদেশের এই ভয়ানক বিপদের বিষয়ে জনগণকে অব্যাহতভাবে সতর্ক করার চেষ্টা করেছি। বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যকার যে সমস্ত অনিষ্পন্ন সমস্যা রয়েছে, তার সবগুলো নিয়ে আলোচনা একটি মাত্র মন্তব্য প্রতিবেদনে সমাপ্ত করা সম্ভব নয়। আজ আমি কেবল ট্রানজিট, পানি আগ্রাসন, বাণিজ্য ঘাটতি এবং সীমান্ত হত্যার মধ্যেই আমার লেখা সীমিত রাখব।
১। ট্রানজিট :
গত মাসেরই ৩ তারিখে ‘ভারতের ট্রানজিটে বাংলাদেশের ফায়দা নাই’ শিরোনামে মন্তব্য প্রতিবেদনে বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে ট্রানজিট প্রদানের পক্ষে বাংলাদেশে জনমত তৈরিতে ভারতপন্থী, পরজীবী বুদ্ধিজীবী ও সুশীল (?) সমাজের অপতত্পরতার বিষয়ে লিখেছিলাম। জাতীয় স্বার্থ বিরোধী এই কর্মকাণ্ড এ দেশে বিগত প্রায় দুই দশক ধরে চালানো হচ্ছে। জনমত বিভ্রান্ত করার অপকর্মে এই মেয়াদে তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী এবং উপদেষ্টাগণ।
গত মাসের ২৫ তারিখে আওয়ামীপন্থী বিএফইউজে ও ডিইউজে আয়োজিত ইফতার অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে ট্রানজিট প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী দুটো মন্তব্য করেছেন। সেখানে তিনি দাবি করেন জিয়াউর রহমানের আমলেই নাকি ট্রানজিট কাঠামো তৈরি হয় এবং সেই দলিলে সই করেছিলেন বাংলাদেশ ও ভারতের তত্কালীন বাণিজ্যমন্ত্রী তানভীর আহমেদ সিদ্দিকী ও প্রণব মুখার্জী। ট্রানজিট প্রদান প্রসঙ্গে তিনি একই অনুষ্ঠানে আরও বলেন, ‘এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে, ট্রানজিট চুক্তি হবে না। কারণ, এখনও অবকাঠামো বা রাস্তাঘাট ঠিক হয়নি।’ ট্রানজিট প্রসঙ্গে ইতিহাস বিকৃত করে জিয়াউর রহমানকে টেনে আনার ব্যাপারটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। শেখ হাসিনা সম্ভবত উপলব্ধি করছেন যে, ভারতকে ট্রানজিট দেয়াটা জাতীয় স্বার্থবিরোধী হচ্ছে এবং সেই কারণেই এর দায়-দায়িত্ব তিনি মরহুম জিয়াউর রহমানের কাঁধে চাপানোর ব্যর্থ চেষ্টায় লিপ্ত হয়েছেন। তিনি যদি সত্যিই বিশ্বাস করতেন যে, ভারতকে ট্রানজিট দিলে বাংলাদেশের প্রকৃতই লাভ হবে, তাহলে সেই কৃতিত্ব অবশ্যই তার পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে দিতেন অথবা নিজে গ্রহণ করতেন। দুর্ভাগ্যবশত তারই পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী প্রধানমন্ত্রীর নতুন ইতিহাস আবিষ্কারের আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যেই তাকে ডুবিয়ে ছেড়েছেন। ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ডিকাব) আয়োজিত ইফতার অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘‘নতুন কোনো চুক্তি ছাড়াই ভারতকে ট্রানজিট দেয়া হবে। ১৯৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা চুক্তিতেই ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দেয়ার কথা বলা আছে। আমরা এখন সেই চুক্তিই বাস্তবায়ন করব। নতুন কোনো চুক্তি বা প্রটোকল সইয়ের প্রয়োজন নেই।”
জিয়াউর রহমানের ওপর ট্রানজিটের দায়-দায়িত্ব চাপানোর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই অনৈতিক চেষ্টা মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি উল্লেখের মাধ্যমে ব্যর্থ করে দিয়েছেন তারই পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী। তবে ড. গওহর রিজভীর তথ্যেও কিছু সংশোধনী প্রয়োজন। ভারতকে ট্রানজিট দেয়ার প্রেক্ষাপট তৈরি করা হয়েছিল আমাদের স্বাধীনতা প্রাপ্তির তিন মাসের মধ্যেই। ১৯৭২ সালের মার্চের ২৯ তারিখে 'Trade agreement between the Government of India and the Government of Bangladesh' শিরোনামে নয়াদিল্লিতে যে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তার অত্ঃরপষব ৫ অর্থাত্ অনুচ্ছেদ ৫ এ বলা হয়েছে,
"The two Governments agree to make mutually beneficial arrangements for the use of their waterways, railways and roadways for commerce between the two countries and for passage of goods between two places in one country through the territory of the other."
(দুই সরকার এই মর্মে সম্মত হচ্ছে যে, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সহায়তা প্রদান এবং একটি দেশের এক অংশ থেকে পার্শ্ববর্তী দেশের ভেতর দিয়ে সেই দেশের অপর অংশে পণ্য পরিবহনের লক্ষ্যে উভয় সরকার পারস্পরিক লাভালাভের ভিত্তিতে যার যার দেশের নৌপথ, রেলপথ এবং সড়ক পথ ব্যবহারোপযোগী করবে।)
দৃশ্যতই ভারতের একতরফা স্বার্থ উদ্ধারের লক্ষ্যে প্রণীত উপরিউক্ত চুক্তিতে সেই সময় স্বাক্ষর করেছিলেন দুই দেশের বাণিজ্যমন্ত্রীদ্বয় যথাক্রমে এম আর সিদ্দিকী এবং এলএন মিশ্র। দিল্লিতে স্বাক্ষরিত ১৯৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি ১৯৭২-এর পুরনো চুক্তিকেই পোক্ত করেছিল। ১৯৭২ এবং ১৯৭৪ সালে সম্পাদিত উভয় চুক্তির সর্বরকম দায়-দায়িত্ব অবশ্যই শেখ মুজিবুর রহমান এবং আওয়ামী লীগকেই বহন করতে হবে। এখানে জিয়াউর রহমানের কোনো ভূমিকা ছিল না। তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছেন ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের মহান সিপাহী জনতা বিপ্লবের মাধ্যমে। এটাই প্রকৃত ইতিহাস। শেখ হাসিনা হিটলারের প্রচারমন্ত্রী গোয়েবলসের পন্থা অনুসরণ করে বার বার মিথ্যা বললেও সেই ইতিহাস পাল্টানো যাবে না। উল্লেখ্য, ভারতকে কোনো চুক্তি ব্যতিরেকেই এই মুহূর্তে ট্রানজিট দিতে উদগ্রীব ড. গওহর রিজভী এর আগে বলেছিলেন, “ভারতকে ট্রানজিট দিতে ৪০ বছর অপেক্ষা করেছি, আর অপেক্ষা করতে আমি রাজি নই।” বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি ভাগ্য নির্ধারণে এই ব্যক্তিটি নিজেকে এতটা গুরুত্বপূর্ণ ভাবছেন কেন, সেটা বুঝতে আমি অক্ষম। লোকমুখে লোকটির নাম আমি প্রথম শুনি এক এগারোর সময়। ডিজিএফআই-এর তত্কালীন ডাকসাঁইটে কর্মকর্তা এবং বর্তমানে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় অভিযুক্ত আসামি মেজর জেনারেল (অব.) আমিন এই ড. গওহর রিজভীকে নিয়েই সেই সময় বিশেষ কারাগারে আটক শেখ হাসিনার সঙ্গে নানান কিসিমের দর কষাকষি সম্পন্ন করেছেন। হয়তো তার সেই সাফল্যের কারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড়ে আসা ব্যক্তিটি পরবর্তীকালে প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত প্রভাবশালী পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা বনে গেছেন।
ড. গওহর রিজভী জনপ্রতিনিধি নন, এমনকি তার প্রকৃত নাগরিকত্ব নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। স্বাধীনতা পরবর্তী চল্লিশ বছরের মধ্যে তিনি ক’দিন বাংলাদেশে অবস্থান করেছেন, তাও এ দেশের জনগণ জানে না। তার পরিবার-পরিজন সম্পর্কেও জাতি সম্পূর্ণ অন্ধকারে। এমন এক রহস্যময় চরিত্র আশ্চর্যজনকভাবে বাংলাদেশের ভাগ্য নিয়ে আজ ছিনিমিনি খেলছেন এবং দেখতে পাচ্ছি, দেশের ষোল কোটি জনতা সেই অনধিকার চর্চা বিনা প্রতিবাদে আবার মেনেও নিচ্ছে! ড. গওহর রিজভীর ট্রানজিটবিষয়ক সর্বশেষ বক্তব্যের তিনদিন আগে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ঢাকায় এক কর্মশালায় বলেছেন, “ট্রানজিট দেয়ার আগে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে হবে। সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই নাজুক হওয়ায় এগুলোর উন্নয়ন ছাড়া এখনই ট্রানজিট সম্ভব নয়।”
উপদেষ্টা কণ্টকিত বর্তমান সরকারের অপর এক প্রভাবশালী ব্যক্তি, অর্থ উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান দিল্লি সফর শেষে ১৯ আগস্ট দেশে ফিরে বলেছিলেন, “মনমোহনের সফরের সময় ট্রানজিট নিয়ে কোনো চুক্তি হবে না। কারণ, ট্রানজিটের বিষয়ে দু’টি প্রটোকল ইতোমধ্যেই স্বাক্ষর হয়েছে।” এই মশিউর রহমানই এর আগে ফতোয়া দিয়েছিলেন যে, ট্রানজিটের বিনিময়ে ফি দাবি করলে আমরা নাকি এক অসভ্য জাতিতে পরিণত হব। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিজ দীপুমনি অপ্রত্যাশিত মন্ত্রিত্ব লাভের পর থেকে তোতা পাখির মতো কানেক্টিভিটির গল্প আউড়ে ট্রানজিটের পক্ষে ওকালতি করেই চলেছেন। বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীনদের এই জাতীয় বিভ্রান্তিকর, পরস্পরবিরোধী বক্তব্য থেকে প্রমাণিত হচ্ছে যে, তারা জাতিকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে দেশের স্বার্থ পুরোপুরি বিকিয়ে দিয়েই ভারতকে করিডোর দিতে আগ্রহী। ১৯৭২ সালের বাণিজ্য চুক্তিতে ‘পারস্পরিক লাভালাভের’ যে বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল, তা থেকেও শেখ হাসিনা সরকার দৃশ্যত সরে এসেছেন। তাদের কাছে ব্যক্তিগত ও ভারতের লাভই বর্তমানে একমাত্র বিবেচ্য, বাংলাদেশের লাভের কোনো প্রয়োজন নেই। এমতাবস্থায়, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জনগণের স্বার্থ রক্ষা করতে হলে এ দেশের ষোল কোটি নাগরিকের ট্রানজিটের মোড়কে করিডোরের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। আমি দেশবাসীর কাছে পুনরায় সেই আহ্বানই জানাই।
২. পানি আগ্রাসন
বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করার পর থেকেই বলে এসেছে তাদের বর্তমান মেয়াদের মধ্যেই ভারতের সঙ্গে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি সম্পন্ন হবে। পত্রপত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে যে, সেই চুক্তির খসড়াও নাকি মন্ত্রিসভা চূড়ান্ত করে ফেলেছে। বাংলাদেশের জনগণ অবশ্য এ বিষয়ে এখনও পর্যন্ত সম্পূর্ণ অন্ধকারে। এ ধরনের একটা আন্তর্জাতিক চুক্তি হওয়ার আগে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার নাগরিকের মধ্যে যে ধরনের মতবিনিময় করা হয়ে থাকে, তার কিছুই তিস্তা নদীর চুক্তির ক্ষেত্রে করা হয়নি। আগস্ট মাসের তৃতীয় সপ্তাহে দিল্লিতে এ বিষয়ে দ্বিপাক্ষিক আলাপ সেরে এসেছেন দুই উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী এবং ড. মশিউর রহমান। এদের মধ্যে কেউ পানি বিশেষজ্ঞ, এমন তথ্য আমার অন্তত জানা নেই। বাংলাদেশের মন্ত্রিসভায় সম্ভবত এখনও একজন পানিসম্পদ মন্ত্রী রয়েছেন। চুক্তির খসড়া প্রস্তুতে তার এবং তার মন্ত্রণালয়ের ভূমিকাটাও কেউ জানে না। এই সম্পূর্ণ অস্বচ্ছ প্রক্রিয়াতেই প্রণীত হতে যাচ্ছে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি। ক্ষমতাসীনদের কর্মকাণ্ডদৃষ্টে কবি শামসুর রাহমানের সেই বহুল পরিচিত কবিতাটির বিখ্যাত পঙিক্তর কথাই মনে পড়ে যাচ্ছে, ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ।’
পানি আগ্রাসন জায়েজ করতে ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ ভারতের কৌশলটাও চমত্কারভাবে কার্যকরী। ভাটির দেশের ন্যায্য হিস্যার কোনোরকম তোয়াক্কা না করে প্রথমে তারা আন্তর্জাতিক নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণ করে একতরফা পানি প্রত্যাহার করতে থাকে দীর্ঘদিন ধরে। কয়েক দশক এই অবস্থা চলার ফলে অসহায় ও দুর্বল ভাটি অঞ্চলের রাষ্ট্রের, এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নদীসমূহ ভরাট হয়ে মরুকরণ প্রক্রিয়া অনেকটা এগিয়ে যাওয়ার পর কোনোরকম একটা চুক্তি চাপিয়ে দিয়ে তারা বাহবা নেয়। একই খেলা আমরা দেখেছি ফারাক্কা বাঁধের বেলায়। তিস্তার ক্ষেত্রেও এর কোনো ব্যতিক্রম হচ্ছে না।
এদিকে দু’দিন আগে বলা হলো, তিস্তা নদীর পানি বণ্টনের বিষয়টি নাকি ড. মনমোহনের সফরের সময় দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের এজেন্ডা থেকেই বাদ দেয়া হয়েছে। কূটনৈতিক মহলে শোনা গেল, আলোচনা থেকে তিস্তা চুক্তি বাদ দেয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন একজন অতি মাত্রায় ভারতপন্থী উপদেষ্টা। সর্বশেষ সংবাদ অনুযায়ী অবশ্য, তিস্তা পানিচুক্তি এজেন্ডায় ফেরত এসেছে। তবে সেই চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ কী পরিমাণ পানি পেতে যাচ্ছে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে আর এক অনিশ্চয়তা। ভারতীয় পত্রপত্রিকায় লেখা হয়েছে গজলডোবা পয়েন্টে পানি ৫২:৪৮ হারে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ভাগাভাগি হবে। অপরদিকে বিবিসি রেডিওতে পশ্চিমবঙ্গের ওই এলাকার সাংসদ বলেছেন, বাংলাদেশ নাকি মাত্র ২৫ শতাংশ পানি পাবে। উল্লেখ্য, গজলডোবা পয়েন্টের আগেই অন্তত ডজনখানেক স্থান থেকে ভারত তিস্তার পানি প্রত্যাহার করে চলেছে। অথচ এসব বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার নিশ্চুপ, জনগণ অন্ধকারে। তিস্তা নিয়ে প্রতিদিন যেভাবে নাটকের স্ক্রিপ্টের পরিবর্তন হচ্ছে, তাতে চুক্তি সই না হওয়া পর্যন্ত কোনোরকম ভরসা পাচ্ছি না।
যাই হোক, একদা নদীমাতৃক বাংলাদেশকে মরুভূমিতে পরিণত হওয়া থেকে বাঁচাতে হলে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর বর্তমান সফরের সময় আমাদের নিম্নোক্ত দাবিগুলো জোরের সঙ্গে, পরিষ্কারভাবে তুলে ধরতে হবে :
১. গঙ্গায় ফারাক্কা বাঁধ এবং তিস্তার উজানে গজলডোবা বাঁধ নির্মাণের ফলে বাংলাদেশের যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ক্ষতি হয়েছে, ভারতকে তার যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
২. অনতিবিলম্বে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করে তিস্তা চুক্তি সম্পন্ন করতে হবে।
৩. টিপাইমুখ বাঁধ প্রকল্প বন্ধের ঘোষণা দিতে হবে।
৪. সীমান্তের ওপারে ৫৪টি আন্তর্জাতিক নদী সংযোগ করে সেই পানি ভারতের দক্ষিণ ও উত্তরাঞ্চলে প্রত্যাহারের পরিবেশ বিপর্যয়কারী যে প্রকল্প ভারত সরকার গ্রহণ করেছে, সেটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করতে হবে।
৩. বাণিজ্য ঘাটতি
বাংলাদেশের শতাধিক পণ্যকে বিনাশুল্কে ভারতের বাজারে রফতানির সুযোগ প্রদানের একটি প্রতিশ্রুতির মুলা নব্বইয়ের দশক থেকে সে দেশের সরকার আমাদের নাকের সামনে ঝুলিয়ে রেখেছে। এদিকে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের ঘাটতি দিন দিন বেড়েই চলেছে। সরকারি হিসেবেই এই ঘাটতির পরিমাণ এখন ২৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ঘাটতি পূরণে কোনো রকম কার্যকর সহায়তা প্রদানের পরিবর্তে বাংলাদেশে উত্পাদিত যে যত্সামান্য পণ্য ভারতে রফতানি হয়ে থাকে, সেটাও বন্ধের জন্য ভারতীয় প্রশাসন নানারকম শুল্ক ও অশুল্ক বাধা অব্যাহতভাবে তৈরি করে চলেছে। ১৯৯৮ সালে তত্কালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ী ঢাকায় এসে অবিলম্বে বাংলাদেশকে শুল্কমুক্ত পণ্য রফতানির যে সুবিধা দানের কথা ঘোষণা করেছিলেন, তার বাস্তবায়ন দীর্ঘ এক যুগেও সম্পন্ন হয়নি। পার্শ্ববর্তী দেশের উত্তর-পূর্বের সাত রাজ্যে বাংলাদেশের পণ্য রফতানির যে সুযোগ এতদিন বিদ্যমান ছিল, সেটাও বাংলাদেশের বর্তমান ভারত-বান্ধব সরকার ট্রানজিট প্রদানের মাধ্যমে চিরতরে শেষ করে দিচ্ছে।
সুতরাং ভারতের বাজার উন্মুক্ত করার জন্য এখনই যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি করা না গেলে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অর্থনীতির পক্ষে এই বিশাল বাণিজ্য ঘাটতির বোঝা বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। ঈদের পূর্ব রাতে হঠাত্ করে একটি সরকারপন্থী ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় স্ক্রলে লেখা দেখলাম, ভারত নাকি তৈরি পোশাকসহ ৪৭টি পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয়ার কথা ঘোষণা করেছে। কিন্তু, গত ক’দিনে এ নিয়ে কোনো মহল থেকেই আর কোনো উচ্চবাচ্য শুনিনি। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সফরে এমন কোনো ঘোষণা আসছে কিনা, সেটা আমাদের জানা নেই। অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে দু’টি আশঙ্কার কথা আগে থেকেই উত্থাপন করে রাখছি। শুল্কমুক্ত পণ্যের তালিকায় এমন কোনো পণ্যের উল্লেখ যেন না থাকে, যা বাংলাদেশে উত্পাদিতই হয় না। একবার শুনেছিলাম, শুল্কমুক্ত পণ্যের তালিকায় নাকি ‘বিমানের যন্ত্রাংশ’ থাকবে। এই প্রকার পণ্য বাংলাদেশে বর্তমানে উত্পাদিত তো হচ্ছেই না, নিকট ভবিষ্যতেও আমাদের সেই প্রযুক্তি অর্জনের কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। শুল্কমুক্ত পণ্য রফতানির সুবিধা পাওয়ার নামে এই প্রকার তামাশা আশা করি বর্তমান সরকার দেশবাসীর সঙ্গে করবে না।
দ্বিতীয়ত, ভারতীয় ঘোষণা কেবলমাত্র কাগজেই যেন সীমাবদ্ধ না থাকে। চল্লিশ বছর ধরে ভারত তিনবিঘা করিডোরসহ বাংলাদেশকে অনেক রকম কাগুজে সুবিধা দিয়েছে। ঘোষণার প্রকৃত বাস্তবায়ন দেখার আগ পর্যন্ত আমাদের ক্ষুদ্র হৃদয়ের মহান প্রতিবেশীর ওপর এ বিষয়ে আস্থা স্থাপন করা সম্ভব নয়।
৪. সীমান্ত হত্যা
সীমান্তে ভারত কর্তৃক নির্মিত কাঁটাতারে কিশোরী ফেলানীর ঝুলন্ত লাশ এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্বের প্রকৃত প্রতিচ্ছবি। গত এক দশক ধরে গড়ে প্রতি সপ্তাহে অন্তত দু’জন দরিদ্র বাংলাদেশী নাগরিককে হত্যা করে চলেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী, বিএসএফ। চল্লিশ বছরের ইতিহাসে ভারতের প্রতি সর্বাপেক্ষা নমনীয় সরকার এ দেশে ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পরও এই নির্মম গণহত্যা বন্ধ হয়নি। বিডিআর যতদিন সীমান্ত রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল, ততদিন অন্তত বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এসব হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানানো হতো। বিডিআর-এর লাশের ওপর বিজিবির জন্মের পর থেকে উল্টো নিহতদেরই চোরাকারবারি, সন্ত্রাসী, ইত্যকার নামে অভিহিত করে বিএসএফ’র হত্যাযজ্ঞকেই এক প্রকার ন্যায্যতা দেয়ার অপচেষ্টা চলছে।
গত দুই মাসে দেখতে পাচ্ছি আমাদের দেশটি ভারতীয় সেনাপতি, মন্ত্রী, উপদেষ্টা এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের বিচরণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। সে দেশ থেকে প্রতিবার একজন হোমরা-চোমরা আসছেন, আর ভাঙা রেকর্ড বাজাচ্ছেন যে এখন থেকে আর কোনো বাংলাদেশী নাগরিককে হত্যা করা হবে না। এটুকুতেই আমাদের ক্ষমতাসীনরা কৃতজ্ঞতার ভারে নুয়ে পড়ছেন। মাস দুয়েক আগে একবার স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে দাঁড়িয়ে দেশবাসীকে ভরসা দিয়েছিলেন যে, ভারতীয় সফরকারী সেনাপ্রধান তাকে নাকি সীমান্ত হত্যা বন্ধের ব্যাপারে কথা দিয়ে গেছেন। আগের অনেক প্রতিশ্রুতির মতো এই প্রতিশ্রুতি ভাঙতেও ভারত খুব একটা বিলম্ব করেনি। সীমান্তে প্রকৃত অবস্থা এতটাই ভয়ানক যে, নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) পর্যন্ত এই হত্যাযজ্ঞের নিন্দা জানিয়ে ভারত সরকারের কাছে অবিলম্বে হত্যা, নির্যাতন বন্ধের দাবি করেছে। গত বছর ডিসেম্বরে 'Trigger Happy : Exessive use of force by Indian troops at the Bangladesh Border' শিরোনামে ৮১ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে মানবাধিকার সংস্থাটি গত দশ বছরে সীমান্তে ৯০০ বাংলাদেশীকে হত্যার কথা বলেছে।
প্রতিবেদনের একটি প্রাসঙ্গিক অংশ এখানে উদ্ধৃত করছি, "Because of the absence of effective accountability mechanism for abuses carried by BSF, even the most serious abuses go unpunished. This sends a clear message that the Indian government finds such abuses acceptable.’
(বিএসএফএ’র নির্যাতন রোধে কোনো কার্যকর জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা না থাকায় অত্যন্ত গুরুতর অপরাধেও কোনো সাজা হচ্ছে না। এখান থেকে পরিষ্কার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, ভারত সরকারের কাছে এসব নির্যাতন গ্রহণযোগ্য।)
ভারতীয় কংগ্রেসের সভানেত্রী এবং ইউপি (UPA) জোট প্রধান মিসেস সোনিয়া গান্ধীর সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফরের সময় সীমান্ত হত্যা নিয়ে ঐজড আরও একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যার শিরোনাম, "India : New killing, Torture at Bangladesh border" মিসেস সোনিয়া গান্ধীর ঢাকায় আগমনের দিনেও বিএসএফ একজন বাংলাদেশীকে হত্যা এবং অপর একজনকে অপহরণ করেছিল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমার প্রশ্ন, এসব অসহায় নাগরিকদের প্রতি তার কি কোনো দায়িত্ব নেই? ফেলানীর ঝুলন্ত লাশের দৃশ্যে তার হৃদয়ে কি কোনো রক্তক্ষরণ হয় না?
আমাদের প্রধানমন্ত্রী নিজেকে দেশের এক নম্বর দেশপ্রেমিক রূপে ঘোষণা দিয়েছেন। বাংলাদেশে সচরাচর সেনাবাহিনীর প্রসঙ্গ এলে সেখানে দেশপ্রেমিকের বিশেষণ লাগানোর এক আজব রেওয়াজ দীর্ঘদিন ধরে চালু রয়েছে। এখন থেকে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রেও সেই রীতি পালন করতে হবে কিনা, সে সম্পর্কে কোনো সরকারি নির্দেশ মিডিয়াকে অবশ্য এখনও দেয়া হয়নি। জুলাই মাসের একুশ তারিখে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সভায় বক্তৃতা দেয়ার সময় সম্ভবত অতি মাত্রায় আবেগতাড়িত হয়ে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, “আমি হয়তো আছি তাই বাংলাদেশ নিরাপদে আছে। আমার চোখ বন্ধ হলে কী হবে তা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন জানেন।” আল্লাহর রহমতে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময় তিনি সুস্থ আছেন, তার চোখও পুরোপুরি খোলা রয়েছে। দেশপ্রেমের পরীক্ষা দেয়ার এক সুবর্ণ সুযোগ আজ শেখ হাসিনার সামনে উপস্থিত।
আগেই বলেছি, গত বছর দিল্লি সফরে তিনি দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং দলীয় ঋণ ভালোভাবেই চুকিয়ে এসেছেন। এ দেশের জনগণও আর স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের সহায়তা প্রদানের একঘেয়ে ঋণের গল্প শুনতে রাজি নয়। এবার দয়া করে দেশ ও জনগণের স্বার্থ বিবেচনা করে ভারতের কাছ থেকে সব বিষয়ে আমাদের ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে পারলেই কেবল দেশপ্রেমের পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হবেন। তখন তাকে নিজ থেকে আর দেশপ্রেমিকের দাবি করতে হবে না। কৃতজ্ঞ দেশবাসী সানন্দে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সেই আসনে বসাবে।
ক্ষমতাপ্রাপ্তির বিনিময়ে কিংবা ক্ষমতালাভের বাসনায় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পায়ে দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দেশপ্রেমের বড়াই জনগণের সঙ্গে শঠতারই নামান্তর। সরকারি এবং বিরোধী পক্ষ এই সত্যটি স্মরণে রাখলে তারাও উপকৃত হবেন, দেশও রক্ষা পাবে।
ইমেইল : admahmudrahman@gmail.com

Thursday, 22 September 2011

মহানবী (সা.) সম্পর্কে কটূক্তিকারী শিক্ষক মদন মোহন পুরস্কৃত

রিয়াজ চৌধুরী
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এবং পবিত্র হজ নিয়ে কটূক্তিকারী শিক্ষক মদন মোহন দাসকে শাস্তির আড়ালে আসলে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা এ শিক্ষককে গণবিক্ষোভের মুখে রাজধানীর ধানমন্ডি সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় থেকে চলতি বছরের ৩১ জুলাই পঞ্চগড় বিপি সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে বদলি করা হয়। সেখানে শিক্ষক মদনের চাকরিচ্যুতি ও দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি তীব্র হলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) সে সময় তাকে বরখাস্ত করেছে বলে সবাইকে জানায়। কিন্তু বরখাস্তের কথা বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের বোকা বানিয়ে উত্তেজিত ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সামাল দেয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মাউশি মহাপরিচালকের নির্দেশক্রমে সহকারী পরিচালক (মাধ্যমিক-১) সাখায়েত হোসেন বিশ্বাস স্বাক্ষরিত ১ আগস্ট এক অফিস আদেশে বলা হয়, মাউশি ঢাকার স্মারক নং-৭এ/২৯-সম (পার্ট-১)/২০০৬/ ৪৫৪৪/১২-সম তারিখ ৩১ জুলাই ২০১১ মোতাবেক ঢাকার ধানমন্ডি গভ. বয়েজ হাইস্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক (চলতি দায়িত্ব) মদন মোহন দাসের পঞ্চগড় বিপি সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে বদলির আদেশ বাতিল করা হলো। তাকে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ১৯৮৫-এর বিধি-৩ ও বিধি-১১ মোতাবেক ১ আগস্ট অপরাহপ্ত থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো। সাময়িক বরখাস্তকালীন সরকারি বিধি মোতাবেক তিনি খোরপোশ ভাতা পাবেন। মদন মোহনকে মাউশি অধিদফতরের উপ-পরিচালকের (মাধ্যমিক) সঙ্গে সংযুক্তির আদেশ জারি করা হলো।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মানুষের ক্ষোভের মুখে শিক্ষক মদন মোহনকে মাউশি কর্তৃপক্ষ বরখাস্ত করেছে বলে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এতে মানুষের ক্ষোভ প্রশমিত হয়। মানুষকে বোকা বানিয়ে মাউশি কর্তৃপক্ষ গোপনে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে উপ-পরিচালকের (মাধ্যমিক) সঙ্গে সংযুক্ত করে প্রকৃতপক্ষে তাকে পুরস্কৃত করেছে। যেখানে মাউশি কর্তৃপক্ষের তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করার কথা, সেখানে তাকে পদোন্নতি দিয়ে তার ক্ষমতাই আসলে বৃদ্ধি করেছে। সংশ্লিষ্টরা আরও বলছেন, মদন মোহন স্কুলশিক্ষক। এ ঘটনায় সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার কারণে তাকে ঢাকায় এসে মাউশি’র কাছে বার বার কৈফিয়ত দেয়ার কথা। কিন্তু তাকে আর এ কষ্টটুকু করতে হলো না। স্কুল থেকে সরাসরি মাউশি’তে স্থান পাওয়ায় তিনি এখন দেশের সব স্কুলশিক্ষকের ওপর খবরদারি করার ক্ষমতা পেয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাউশি মহাপরিচালক প্রফেসর মো. নোমান উর রশীদ আমার দেশকে বলেন, শিক্ষক মদন মোহনের বিষয়টি জানার পর তার বিরুদ্ধে তাত্ক্ষণিকভাবে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য আমি সংশ্লিষ্ট শাখায় নির্দেশ দিই। তিনি জানান, একজন সরকারি কর্মকর্তাকে সরাসরি বরখাস্তের বিধান নেই। একটি আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তার প্রাপ্ত সাজা কার্যকর করতে হয়। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। প্রফেসর নোমান জানান, সৃষ্ট ঘটনার সময় দেশের যে প্রতিষ্ঠানেই তাকে পোস্টিং দেয়া হতো, সেখানে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো। বিক্ষোভ মিছিল ও সভা-সমাবেশ হতো। তাই মদন মোহনকে সাময়িক বরখাস্ত করে মাউশি’তে এনে বসিয়ে রাখা হয়েছে। তাকে কোনো শিক্ষকের ওপর খবরদারি করার ক্ষমতা দেয়া হয়নি বলে জানান তিনি।
প্রসঙ্গত, ধানমন্ডি গভর্নমেন্ট বয়েজ স্কুলের ভারপ্রাপ্ত সহকারী প্রধান শিক্ষক থাকাকালে ২৬ জুলাই মদন মোহন দাস তার সহকর্মী শিক্ষকদের এক সভায় মন্তব্য করেন, ‘এক লোক সুন্দরী মহিলা দেখলেই বিয়ে করে। এভাবে বিয়ে করতে করতে ১৫-১৬টি বিয়ে করে। মুহাম্মদও ১৫-১৬টি বিয়ে করেছে। তাহলে মুসলমানরা মুহাম্মদের হজ করা স্থান মক্কায় গিয়ে হজ না করে ওই ১৫-১৬টি বিয়ে করা লোকের বাড়িতে গিয়ে হজ করলেই তো হয়।’—এমন মন্তব্যে কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও উত্তেজনা দেখা দেয়। এর প্রতিবাদে স্কুল ক্যাম্পাসে ব্যাপক বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থীরা। বিক্ষোভকালে শিক্ষক মদন মোহন দাসকে চাকরি থেকে অপসারণ ও তার বিচার দাবি করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে মাউশি অধিদফতরের ডিজিকে ঘটনা তদন্ত করে খুব দ্রুত ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। গণবিক্ষোভের মুখে ধানমন্ডি সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় থেকে গত ৩১ জুলাই তাকে পঞ্চগড় বিপি সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে বদলি করা হয়। সেখানে গিয়ে জনরোষের মধ্যে পড়েন তিনি। তার চাকরিচ্যুতি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি ওঠে। বিক্ষোভ তীব্র হতে থাকলে মাউশি অধিদফতর ১ আগস্ট অপরাহপ্ত থেকে মদন মোহনকে বরখাস্ত করেছে বলে সবাইকে জানানো হয়। ফলে মানুষের ক্ষোভ প্রশমিত হয়।
জানা যায়, টাঙ্গাইলের অধিবাসী মদন মোহন দাস ২০১০ সাল থেকে ভারপ্রাপ্ত সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তিনি বিভিন্ন সময় শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সঙ্গে হজরত মুহাম্মদ (সা.) এবং ইসলাম ধর্মের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কটূক্তি করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রসঙ্গত, ১৫ জুলাই গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার জিটি পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের ইংরেজির শিক্ষক শঙ্কর বিশ্বাস মণ্ডল মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে কটূক্তি করেন। দশম শ্রেণীর ক্লাসে শিক্ষক শঙ্কর মণ্ডল বিশ্বাস দাড়ি রাখা নিয়ে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে ছাগলের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। এতে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

Tuesday, 9 August 2011

মন্তব্য প্রতিবেদন : বাংলাদেশে আক্রান্ত ইসলাম
















মাহমুদুর রহমান
ক’দিন আগে অন্য একটি পত্রিকায় কর্মরত এক সিনিয়র রিপোর্টারের কাছ থেকে বাংলাদেশে ইসলামবিদ্বেষী মিডিয়ায় প্রচারণার এক বিস্ময়কর গল্প শুনেছি। একদিন পত্রিকাটির সম্পাদকমণ্ডলীর একজন নীতিনির্ধারক সেই রিপোর্টারকে ডেকে এদেশে ‘ইসলামী জঙ্গিবাদের’ পুনরুত্থানের ওপর জরুরি ভিত্তিতে একটা স্টোরি লিখতে নির্দেশ দিলেন। সাংবাদিকটি দেশের কোন জায়গায় নতুন করে এই জঙ্গিবাদের উত্থান হয়েছে, সেই তথ্য জানতে চাইলে সম্পাদক মহোদয় অগ্নিশর্মা হয়ে তাকে বললেন, জঙ্গি আছে কী নেই সেটা বিষয় নয়, স্টোরি লিখতে বলেছি, লিখে আনেন। বেচারা সিনিয়র রিপোর্টার বুঝতে পারলেন পেশাদার, ‘স্বাধীন’ সম্পাদক মহাশয় মালিকের নির্দেশ পালন করছেন মাত্র। পত্রিকার মালিকও হয়তো সরকারের ওপর মহল কর্তৃক বিশেষ উদ্দেশ্যে এ ধরনের প্রচারণা চালানোর জন্য নির্দেশিত হয়েছেন। আমার পত্রিকা অফিসে বসে সেই সিনিয়র রিপোর্টার যেদিন এই ঘটনাটি বলছিলেন, তার আগের দিনেই চরম মুসলমানবিদ্বেষী এক মৌলবাদী খ্রিস্টান যুবক নরওয়ের রাজধানী অসলোতে গুলি চালিয়ে এবং বোমা ফাটিয়ে প্রায় একশ’ স্বদেশীকে হত্যা করেছে। তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী সে নাকি ইউরোপকে মুসলিম অধিগ্রহণ থেকে রক্ষা করার ‘মহান’ উদ্দেশ্যেই এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। এই সন্ত্রাসী কাণ্ডের পর ‘সব মুসলমান সন্ত্রাসী নয়, তবে সব সন্ত্রাসী মুসলমান’, ভারত ও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী এবং আমাদের সুশীল (?)দের একাংশের এই প্রিয় তত্ত্বের কী হাল হবে, সেটি তারাই বিবেচনা করুক। ইউরোপে সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলা সম্পর্কে ইউরোপোল-২০০৯ প্রতিবেদন এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬-২০০৮ সময়কালে ইউরোপে যতগুলো সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে, তার মধ্যে মাত্র ০.৪ শতাংশ মুসলিম উগ্রবাদী কর্তৃক পরিচালিত হয়। ২০০৬ সালে ৪৯৮টি ঘটনার মধ্যে মাত্র একটিতে, ২০০৭ সালে ৫৮৩টি ঘটনার মধ্যে ৪টিতে এবং ২০০৮ সালে ৫১৫টির মধ্যে শূন্যটিতে ইসলামিস্টরা জড়িত ছিল। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ৯৯.৬ শতাংশ সন্ত্রাসী ঘটনার জন্য অমুসলিমরাই দায়ী। আমার আজকের লেখার মূল বিষয়বস্তু বাংলাদেশ পরিস্থিতি বিধায় পাশ্চাত্য নিয়ে কথা আর না বাড়িয়ে স্বদেশের দিকে দৃষ্টিপাত করছি। বর্তমান সেক্যুলার সরকারের আড়াই বছরে বাংলাদেশে ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়ানোর লক্ষ্যে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় চরম নিন্দনীয় যে কাজ-কর্মগুলো করা হয়েছে, তার মধ্য থেকে কয়েকটির দিকে পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করছি।১. ২০০৯ সালের ২৮ মার্চ ‘সন্ত্রাস নিরসনে ধর্মীয় নেতাদের ভূমিকা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক সামীম মোহাম্মদ আফজাল বলেছেন, পৃথিবীতে যত সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ রয়েছে, তার সবই ইসলাম ও মুসলমানদের মধ্যে (!)। হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানদের মধ্যে কোনো সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নেই। হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানরা সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত নয়। ২. ২০০৯ সালের ১ এপ্রিল এদেশের আওয়ামীপন্থী শিল্পপতিদের অর্থে পরিচালিত সুশীল (?) থিংক ট্যাংক বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট আয়োজিত ওয়ার্কশপে বক্তৃতায় বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেছিলেন, কওমি মাদরাসাগুলো এখন জঙ্গিদের প্রজনন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। কওমি মাদরাসাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ বিস্তার লাভ করেছে। এসব কওমি মাদরাসায় যে শিক্ষা দেয়া হয়, তা কূপমণ্ডূকতার সৃষ্টি করছে। ’৭৫-পরবর্তী সামরিক শাসনামলে বিভিন্ন সংশোধনী এনে ’৭২-এর সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতার চেতনাকে নস্যাত্ করার ফলেই এবং ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণার পর ধর্মের নামে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়েছে। ৩. ২০০৯ সালের ২৩ এপ্রিল বরিশালের নিউ সার্কুলার রোডের এক বাড়িতে র্যাব হানা দিয়ে বোরকা পরে ধর্মীয় শিক্ষার জন্য জড়ো হওয়ার অপরাধে ২১ নারীকে গ্রেফতার করে। র্যাব সাংবাদিকদের কাছে তাদের অভিযানের সংবাদ জানালে তা ফলাও করে ছাপা হয়। দিনভর জিজ্ঞাসাবাদ শেষে জঙ্গিসংশ্লিষ্টতার কোনো তথ্য না পেয়ে ২১ পরহেজগার নারীকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে চালান দেয়া হয়। ঘটনার দীর্ঘ ২ মাস পর ২৩ জুন আদালত তাদের বেকসুর খালাস দেন।৪. ২০০৯ সালের ১৯ জুন রাজশাহীতে জঙ্গি সন্দেহে ১৫ নারী ও শিশুকে গ্রেফতার করা হয়। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ওইদিন বিকালেই মুচলেকা দিয়ে তাদের মুক্ত ঘোষণার পর আবার ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখানো হয়। পুলিশ গ্রেফতারকৃতদের সম্পর্কে ব্যাপক তদন্ত করেও জঙ্গিসংশ্লিষ্টতার কোনো তথ্য পায়নি। শেষ পর্যন্ত আদালত তাদের বেকসুর খালাস দিলে জুলাই মাসের ১ তারিখে ১১ দিন কারাবাস শেষে ১৫ জন নিরপরাধ নাগরিক মুক্তি পান। ৫. বোরকা পরার অপরাধে ২০০৯ সালের ৩ জুলাই পিরোজপুর জেলার জিয়ানগরে ছাত্রলীগের বখাটে কর্মীদের প্ররোচনায় পুলিশ জঙ্গি সন্দেহে তিন তরুণীকে গ্রেফতার করে। তারপর পুলিশের আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করলে তিন তরুণীকে ঢাকায় টিএফআই সেলে নিয়ে আসা হয়। ৫৪ ধারায় গ্রেফতারকৃত তরুণীদের বিরুদ্ধে মামলায় তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন অমর সিংহ। এ সময় তাদের বোরকা খুলতে বাধ্য করে মহাজোট সরকারের দিনবদলের পুলিশ। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদেও কোনো জঙ্গি সংযোগের কাহিনী বানাতে ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ফাইনাল রিপোর্ট দিতে বাধ্য হয়। দীর্ঘদিন কারাগারে বন্দি থেকে অবশেষে তিন অসহায়, নিরপরাধ তরুণী মুক্তি পান।৬. ২০১০ সালের ৩ এপ্রিল সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হয় যে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ড. একেএম শফিউল ইসলাম তার ক্লাসে ছাত্রীদের বোরকা পরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। তিনি ক্লাসে ‘মধ্যযুগীয় পোশাক বোরকা’ পরা যাবে না এবং এটি সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের কোনো পোশাক হতে পারে না বলে ফতোয়া জারি করেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এটি বিভাগীয় কোনো সিদ্ধান্ত নয়, তবে আমার ক্লাসে কোনো ছাত্রীকে আমি বোরকা পরতে দেব না।৭. ২০১০ সালের ১ আগস্ট বিশ্ব শান্তি পরিষদের প্রেসিডেন্ট পরিচয়দানকারী জনৈক দেবনারায়ণ মহেশ্বর পবিত্র কোরআন শরিফের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন। রিট আবেদনে তিনি দাবি করেন, হজরত ইবরাহিম (আ.) তার বড় ছেলে ইসমাইল (আ.)কে কোরবানির জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন বলে যে আয়াত পবিত্র কোরআন শরিফে রয়েছে, তা সঠিক নয়। তিনি দাবি করেন, হজরত ইবরাহিম তার ছোট ছেলে হজরত ইসহাক (আ.)কে কোরবানি করতে নিয়ে যান। এ বিষয়ে সঠিক ব্যাখ্যা ও কোরআনের আয়াত শুদ্ধ করার জন্য দেবনারায়ণ মহেশ্বর আদালতের কাছে প্রার্থনা করেন। আদালত রিট খারিজ করে দেয়ার পর দেবনারায়ণের এই চরম হঠকারী ও উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ডে আদালতে উপস্থিত আইনজীবীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে পুলিশ দেবনারায়ণ মহেশ্বরকে কর্ডন সহকারে এজলাস থেকে বের করে তাদের ভ্যানে প্রটেকশন দিয়ে আদালত এলাকার বাইরে নিরাপদ অবস্থানে নিয়ে যায়।৮. বিচারপতি এইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক ও বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেনের দ্বৈত বেঞ্চ ২০১০ সালের ২২ আগস্ট স্বপ্রণোদিত (সুয়োমোটো) আদেশ প্রদান করেন যে, দেশের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অফিসে বোরকা পরতে বাধ্য করা যাবে না। ‘নাটোরের সরকারী রাণী ভবানী মহিলা কলেজে বোরকা না পরলে আসতে মানা’ শিরোনামে ২২ আগস্ট একটি দৈনিকে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার প্রেক্ষিতে হাইকোর্টের বিচারপতিদ্বয় বোরকা পরিধানের বিরুদ্ধে সুয়োমোটো এই রায় দেন।৯. ২০১১ সালের ২ জুন সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের অন্যতম নেতা মেজর জেনারেল (অব.) কে এম শফিউল্লাহ দাবি করেন, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, বিসমিল্লাহ ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি—এ তিনটির বিরুদ্ধে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। ওইদিন জাতীয় প্রেস ক্লাবের মতবিনিময় সভা থেকে ঘোষণা করা হয় যে, সংবিধানে বিসমিল্লাহ ও রাষ্ট্রধর্ম থাকলে হরতাল দেয়া হবে।১০. ২০১১ সালের ৩০ জুন সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী গ্রহণ করে আমাদের সংবিধানের মূল নীতি থেকে আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস বাদ দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিস্থাপন করা হয়।১১. ২০১১ সালের ১৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পিতৃভূমি টুঙ্গিপাড়া উপজেলার জিটি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরেজি শিক্ষক শঙ্কর বিশ্বাস দশম শ্রেণীর ক্লাসে দাড়ি রাখা নিয়ে সমালোচনাকালে হজরত মোহাম্মদ (সা.)কে ছাগলের সঙ্গে তুলনা করেন। এতে ওই ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। পরে পুরো এলাকায় সাধারণ জনগণের মধ্যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে শঙ্কর বিশ্বাস টুঙ্গিপাড়া থেকে পালিয়ে যান।১২. ২০১১ সালের ২৬ জুলাই ধানমন্ডি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত সহকারী প্রধান শিক্ষক মদন মোহন দাস মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) এবং পবিত্র হজ নিয়ে কটূক্তি করেন। সহকর্মী শিক্ষকদের সঙ্গে এক সভায় তিনি মন্তব্য করেন, ‘এক লোক সুন্দরী মহিলা দেখলেই বিয়ে করে। এভাবে বিয়ে করতে করতে ১৫/১৬টি বিয়ে করে। মুহাম্মদও ১৫/১৬টি বিয়ে করেছে। তাহলে মুসলমানদের মুহাম্মদের হজ করা স্থান মক্কায় গিয়ে হজ না করে ওই ১৫/১৬টি বিয়ে করা লোকের বাড়িতে গিয়ে হজ করলেই তো হয়।’বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অন্তত ৮৫ শতাংশ যে জন্মসূত্রে মুসলমান এ নিয়ে সম্ভবত বিতর্ক নেই। সেই দেশে আড়াই বছর ধরে অব্যাহতভাবে ইসলাম, কোরআন, হাদিস এবং মহানবী (সা.)কে কটাক্ষ করার অভ্যাস চর্চার ফলে ইসলামবিদ্বেষ এখন সরকারের সর্বত্র প্রায় দুরারোগ্য ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে এবং এই ব্যাধির ভাইরাস ক্ষমতাসীন মহলের সব পর্যায়ের লোকজন অকাতরে বিতরণ করে চলেছেন। ইউরোপে অসুস্থ ইসলামবিদ্বেষ সর্বব্যাপী হয়ে ওঠার বিষক্রিয়াতেই নরওয়েতে অ্যানডার্স বেরিং ব্রেইভিক (Anders Behring Breivik) নামক খ্রিস্টান মৌলবাদী ঘাতকের উত্থান ঘটেছে। দীর্ঘদিন ধরেই ইউরোপে ইসলাম, মুসলমান এবং আমাদের মহানবী (সা.)কে বিকৃতভাবে উপস্থাপনের চর্চা চলছে। ডেনমার্কে হজরত মুহাম্মদ (সা.)কে নিয়ে সাম্প্রদায়িক কার্টুন ছাপা এবং বাকপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে পাশ্চাত্যের জনগোষ্ঠীর এক বিরাট অংশের এই অতীব নিন্দনীয় কর্মকাণ্ডকে সমর্থনের ফলে জন্মলাভ করা বিষবৃক্ষের স্বাদ তারাই আজ আস্বাদন করছে। নরওয়ের সুবুদ্ধিপূর্ণ রাজনীতিবিদরা অবশেষে স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছেন যে, এই ঘৃণ্য মানসিকতার আশু চিকিত্সা করা না হলে পশ্চিমের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। মধ্যযুগের ইউরোপে এ-জাতীয় অন্ধ ধর্মীয় ঘৃণা ও বিদ্বেষ বিকশিত হওয়ার ফলেই তখন সেখানে যাজকদের নির্দেশে ডাইনি আখ্যা দিয়ে নারীদের পুড়িয়ে মারা হয়েছে এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইউরোপের দেশে দেশে চরমপন্থী খ্রিস্টানদের হাতে ইহুদি ধর্মাবলম্বীরা নিগৃহীত, অত্যাচারিত হয়েছে। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির মতো করেই আজ পূর্ব ইউরোপে ইহুদি বিদ্বেষ এবং পশ্চিম ইউরোপে ইসলামবিদ্বেষ দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। অসলো হত্যাকাণ্ডের তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ইসলামবিদ্বেষী পশ্চিমা মিডিয়া কর্তৃক এর দায়ভার কথিত ইসলামী জঙ্গির ঘাড়ে চাপানোর দুর্ভাগ্যজনক অপচেষ্টাও আমরা লক্ষ্য করেছি। ১৯৯৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা সিটিতে এক ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় শত শত মার্কিন নাগরিক নিহত হলে সেখানেও প্রাথমিকভাবে মৌলবাদী মুসলমানদের দায়ী করা হয়েছিল। তার ক’দিনের মধ্যেই প্রকৃত ঘাতক মৌলবাদী খ্রিস্টান টিমোথি ম্যাকভেই (Timothy McVeigh)-এর নাম বিশ্ববাসী জেনে ফেলে।২০০৮ সালে বাংলাদেশের সর্বাধিক প্রচারিত সুশীল (?) বাংলা দৈনিকে মহানবী (সা.) এবং তাঁর সাহাবিকে কটাক্ষ করে ইউরোপের অনুরূপ ছড়া এবং কার্টুন ছাপা হলে দেশে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। জেনারেল মইনের তত্কালীন জরুরি সরকারের উদ্যোগে বায়তুল মোকাররম মসজিদের খতিব উবায়দুল হকের কাছে উপস্থিত হয়ে পত্রিকাটির প্রখ্যাত ‘সেক্যুলার’ সম্পাদকের জোড় হস্তে ক্ষমাপ্রার্থনার ফলে সেই সময় ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ক্ষোভ খানিকটা প্রশমিত করা সম্ভব হয়েছিল। বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশে ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্বজাধারীদের হৃদয়ে গভীরভাবে প্রোথিত নরওয়ের ব্রেইভিকের সমতুল্য ইসলামবিদ্বেষ সময়-সুযোগমত জনসমক্ষে প্রকাশ পায়। মুখে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা প্রচার করলেও অন্তরে এদের অধিকাংশই চরমভাবে সাম্প্রদায়িক। এদের সাম্প্রদায়িকতা অবশ্য মূলত ইসলাম ধর্মবিরোধী। ইসলাম ছাড়া অন্য সব ধর্মমতের প্রতিই তাদের প্রগাঢ় শ্রদ্ধা। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফের দাবি অনুযায়ী ডিজিএফআই’র কারসাজিতে মহাজোট সরকার ক্ষমতাসীন হলে বাংলাদেশে চিহ্নিত ইসলামবিরোধী গোষ্ঠীর এদেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের ধর্মের বিরুদ্ধে সুসংগঠিত আক্রমণ চালানোর সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়। গত আড়াই বছরে ইসলাম ধর্মের প্রতি ঘৃণা ছড়ানোর প্রাথমিক কিছু নমুনা আমরা দেখতে পেয়েছি।বাংলাদেশের অধিকাংশ নাগরিক যে বর্তমান সরকারের গণবিরোধী কর্মকাণ্ডে বীতশ্রদ্ধ হয়ে তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছে, সেটি সম্ভবত নীতিনির্ধারকদের অজানা নয়। গত এক বছরের স্থানীয় সরকার পর্যায়ের সবক’টি নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে যে কোনো নিরপেক্ষ বিশ্লেষক নিশ্চিতভাবেই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন যে, মহাজোট সরকারের পায়ের তলায় আর মাটি নেই। জনসমর্থনহীন শাসকশ্রেণী যে কোনো মূল্যে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য স্বাভাবিকভাবেই ক্রমেই অতিমাত্রায় বিদেশনির্ভর হয়ে পড়ছে। দেশের স্বার্থ বিকিয়ে ভারতের সব অন্যায্য চাহিদা পূরণ করার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের সাম্রাজ্যবাদী প্রতিবেশীর একমাত্র বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য মিত্রে পরিণত হতে পেরেছেন। সুতরাং ধরে নেয়া যেতে পারে যে, ভারতীয় শাসককুল শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় আসীন রাখার জন্য যথাসম্ভব প্রচেষ্টা চালাবে। লন্ডনের ‘ইকোনমিস্টে’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৮ সালের নির্বাচনেও ভারত মহাজোটকে টাকার থলি এবং এন্তার পরামর্শ দিয়ে নির্বাচনে জিততে সহায়তা করেছিল। আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতায় একমাত্র ভারতের সহযোগিতায় বাংলাদেশের জনমতের বিরুদ্ধে ক্ষমতায় টিকে থাকা যে সম্ভব নয়, সেটা শেখ হাসিনার মতো ঝানু রাজনীতিবিদ অবশ্যই বোঝেন। ২০০৮-এর পরিস্থিতির মতো ভারতের সমর্থনের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থন যুক্ত হলে দেশের জনগণকে তখন মহাজোটের আর তোয়াক্কা না করলেও চলবে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় অব্যাহত ইসলামবিরোধিতা সম্ভবত সেই সমর্থন আদায়েরই কৌশল।বাংলাদেশে সীমিত পরিসরে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটেছিল শেখ হাসিনারই আগের শাসনামলে। সেই দুর্ভাগ্যজনক ও চরম নিন্দনীয় জঙ্গিবাদও মাথাচাড়া দিয়েছিল আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটেই। আশির দশকে আফগানিস্তানে সোভিয়েট দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রামে কিছু বাংলাদেশী নাগরিকও যোগদান করেছিল। তারাই এদেশে মূলত জঙ্গিবাদের বীজ বহন করে নিয়ে এসেছে। এখানে উল্লেখ্য, সে সময় আফগানিস্তানের রণাঙ্গনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রগুলো তাদের আদর্শগত সোভিয়েটবিরোধিতার কারণে মুজাহিদদের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছিল। ফলে আশির দশকে মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য ইসলামিক রাষ্ট্র থেকে স্বেচ্ছাসেবকরা আফগানিস্তানে সোভিয়েট দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গেলে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব তাতে সায় দিয়েছিল। ২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নির্বাচনে বিজয় লাভের ঠিক আগে নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে বিমান হামলা বিশ্বরাজনীতির হিসাব-নিকাশ সম্পূর্ণ পাল্টে দেয়। বিশ্বব্যাপী জোরেশোরে কথিত ইসলামী জঙ্গিবাদবিরোধী প্রচারণা শুরু হলে বাংলাদেশও তার প্রভাবমুক্ত থাকতে পারেনি। কাকতালীয়ভাবে একই সময়ে বাংলাদেশে শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলাভাইয়ের রাষ্ট্র ও ধর্মবিরোধী জঙ্গি কর্মকাণ্ড এবং তাদের উত্থানের প্রাথমিক পর্যায়ে তত্কালীন সরকারের মধ্যকার এক ধরনের নির্লিপ্ততা পশ্চিমের সঙ্গে বিএনপির নীতিনির্ধারকদের দূরত্ব সৃষ্টি করে। শেষপর্যন্ত বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলেই উভয় জঙ্গি নেতার গ্রেফতার ও তাদের বিচার সম্পন্ন হলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর নীতিনির্ধারকরা তাতেও পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারেননি। যে কোনো বিচক্ষণ রাজনীতিবিদের মতোই শেখ হাসিনা প্রতিপক্ষের এই দুর্বলতার সুযোগ গ্রহণ করে প্রেসিডেন্ট বুশের কথিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ (war against terror)'র সঙ্গে প্রকাশ্যে একাত্মতা ঘোষণা করেন। সেই থেকে মার্কিন সমর্থন ধরে রাখার লক্ষ্যে শেখ হাসিনা তার ইসলামী জঙ্গি কার্ড অবিরাম খেলে চলেছেন। ফলে বাংলাদেশ আজ এমন একটি মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে ইসলামবিরোধী নগ্ন প্রচারণা কোনো ব্যতিক্রম নয়; বরং দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা। যে সংবাদপত্রের ঘটনা দিয়ে আজকের মন্তব্য-প্রতিবেদন শুরু করেছি, তারাও সরকারের হুকুম তামিল করে চলেছেন মাত্র। উত্তরার র্যাব-১ হেডকোয়ার্টারে অবস্থিত টিএফআই সেলে রিমান্ডে থাকা অবস্থায় আমি নিজ চোখে শ্মশ্রুমণ্ডিত তরুণ এবং মধ্যবয়সীদের সেখানে আটক দেখতে পেয়েছি। তাদের গোঙানির শব্দ থেকে নির্যাতনের মাত্রাটাও খানিক আন্দাজ করতে পেরেছি। ক’দিন পরপর টেলিভিশনের পর্দায় ইসলামী জঙ্গি নাম দিয়ে যাদের আটক দেখানো হয়, তাদেরও হয়তো উপরের নির্দেশে প্রয়োজনমাফিক টিএফআই সেল মার্কা নির্যাতনকেন্দ্রগুলো থেকেই সরবরাহ করা হয়। এর মাধ্যমে মার্কিন নীতিনির্ধারকদের কাছে শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ইসলামী জঙ্গি দমনে তার অপরিহার্যতা প্রমাণের চেষ্টা করছেন।প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপে নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ইউনূসকে সরকার চরমভাবে অপমানিত করায় সরকারের সঙ্গে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের যে টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছে, নিয়মিতভাবে জঙ্গিনাটক মঞ্চায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের নীতিনির্ধারকরা সেই দূরত্ব কমানোর প্রাণপণ চেষ্টা করছেন। তাদের মূল লক্ষ্য সম্ভাব্য গৃহপালিত বিরোধীদলীয় নেতা এরশাদকে সঙ্গে নিয়ে আগামী ভোটারবিহীন একদলীয় নির্বাচনের আন্তর্জাতিক বৈধতা লাভ। ২০০৮ সালে নির্বাচনের মাত্র মাসখানেক আগে দেশে ফেরার সময় শেখ হাসিনা ওয়াশিংটনে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তত্কালীন বুশ প্রশাসনকে প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়ে নির্বাচনে ফায়দা লাভে সমর্থ হয়েছিলেন। বাংলাদেশে আগামী সাধারণ নির্বাচনের আগেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে যাবে। সেই নির্বাচনে যিনিই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হোন না কেন, এখানে শেখ হাসিনা তার গতবারের সফল ইসলামী জঙ্গি কার্ডই যে ব্যবহার করবেন, সেটা নিশ্চিত।
সাম্য ও শান্তির ধর্ম ইসলামে জঙ্গিবাদ যে সর্বতোভাবে পরিত্যাজ্য, এ নিয়ে ইসলামের প্রকৃত আদর্শে বিশ্বাসীদের মধ্যে কোনো মতবিরোধ নেই বলেই আমার ধারণা। কিন্তু একই সঙ্গে জালিম শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোও একজন ঈমানদার মুসলমানের কর্তব্য। বাংলাদেশে কল্পিত ইসলামী জঙ্গিতত্ত্ব বিদেশে ফেরি করে যারা ক্ষমতায় টিকে থাকতে চাচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসীদের ঐক্যবদ্ধ হয়েই মিথ্যা প্রচারণার জবাব দিতে হবে। ভারতীয় সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতায় বিমোহিত হয়ে যারা আমাদের সংবিধান থেকে আল্লাহর ওপর বিশ্বাস ও আস্থা সরিয়ে ফেলার ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন, তাদের নরেন্দ্র মোদীর গুজরাটের দিকে দৃষ্টিপাত করতে অনুরোধ জানাই। বাংলাদেশে আড়াই বছর ধরে যা ঘটে চলেছে, তার উল্টোটি গুজরাটে ঘটলে সেখানে অসহায় সংখ্যালঘুদের ভাগ্যে কী হতো, তার নমুনা ২০০২ সালে দেখা গেছে। সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা লেখা থাকলেই যে জনগণ অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী হয় না, তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ প্রতিবেশী ভারত। অপরদিকে সংবিধানে বিসমিল্লাহ এবং আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস লিপিবদ্ধ থাকলেই যে দেশের নাগরিকরা সাম্প্রদায়িক হয়ে পড়েন না, তার উজ্জ্বল উদাহরণ আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মিলে-মিশে থাকা বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর হাজার বছরের ঐতিহ্য। আশা করি, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করার ঘৃণ্য কৌশল হিসেবে ক্ষমতাসীনরা ধর্মনিরপেক্ষতার ছদ্মাবরণে ইসলামবিরোধী সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করে তুলবেন না।

Friday, 5 August 2011

ভারতের ট্রানজিটে বাংলাদেশের ফায়দা নাই

মাহমুদুর রহমান

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিজ দীপু মনি এবং এ দেশের ভারতপন্থী বুদ্ধিজীবী, অর্থনীতিবিদ ও সুশীল (?) শ্রেণীর হালের প্রিয় শব্দ কানেক্টিভিটি। ইংরেজি connectivity শব্দটি connect থেকে এসেছে। কানেক্ট-এর বাংলা আভিধানিক অর্থ সংযুক্ত করা বা সম্বন্ধ স্থাপন করা। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ট্রানজিটের মাধ্যমে ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বের সাত রাজ্যের যোগাযোগের ব্যবস্থা বা পড়হহবপঃ করা আঞ্চলিক সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রটির দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা।

সাবেক পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান যেমন ভৌগোলিকভাবে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ছিল, সাত রাজ্যের সঙ্গে দিল্লির অবস্থাটা সেরকম বিপজ্জনক না হলেও নিরাপত্তা ও অন্যান্য বিবেচনায় যোগাযোগের একটা বড় সমস্যা তাদেরও জন্মাবধি রয়েছে। বর্তমান অবস্থায় শিলিগুড়ির কথিত চিকেন নেক (chicken neck) অংশটি কোনো কারণে কাটা পড়লে সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে সাত রাজ্য দিল্লি থেকে সাবেক পাকিস্তানের দুই অংশের মতোই পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। তাছাড়া বর্তমান অবস্থাতেও বিদ্রোহকবলিত সাত রাজ্যের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ ব্যয়বহুল, বিপজ্জনক এবং সামরিক কৌশলগত বিবেচনায় সর্বদাই ঝুঁকিপূর্ণ। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভেঙে দুটো আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ভারতের শাসকশ্রেণী তাদের গুরুতর এই সমস্যার সমাধানে নানারকম কৌশল প্রয়োগ করে চলেছে। ১৯৭১ সালে ভারতের সহায়তায় উপমহাদেশে বাংলাদেশ নামক তৃতীয় স্বাধীন ভূখণ্ডের অভ্যুদয় তাদের দীর্ঘদিনের মাথা ব্যথা নিরাময়ের এক সুবর্ণ সুযোগ এনে দেয়।
পাকিস্তানি পরাজিত দখলদার বাহিনী ভারত ও মুক্তিবাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ করে। আমাদের বিজয়ের সাড়ে ছয় মাসের মাথায় ভারত তত্কালীন বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে বন্যাকবলিত কাছাড় জেলায় জরুরি পণ্য পরিবহনের জন্য সর্বপ্রথম নৌ-ট্রানজিট সুবিধাটি আদায় করে নেয়। সেই সময় আসামে ভয়াবহ বন্যার ফলে কাছাড়ের সঙ্গে রাজ্যের বাকি অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। ১৯৭২ সালের জুলাই মাসের ১ তারিখে ভারত সরকার নৌ-ট্রানজিট সংক্রান্ত নিম্নোক্ত প্রেসনোট জারি করে :

"Press note issued by the Government of India declaring that essential supplies to Cachar district will be allowed through Bangladesh waterways.
New Delhi, July 1, 1972
Transit facilities to Indian steamers from Calcutta or Gauhati to Cachar district in Assam through Bangladesh waterways have been made available following clearance by the Government of Bangladesh. The Union Ministry of Shipping and Transport has directed the Central Inland Water Transport Corporation Ltd., a public sector undertaking, to arrange movement of essential supplies to the region. The Government of India have greatly appreciated the gesture of the Bangladesh Government.
It may be recalled that surface communications between Cachar district and the rest of the country have been virtually cut off due to the devastating floods caused by the Brahmaputra and Barak rivers in Assam. The use of Bangladesh waterways will facilitate the movement of essential supplies to the flood-affected region."
(কাছাড় জেলায় অত্যাবশ্যকীয় পণ্য পরিবহনের নিমিত্ত বাংলাদেশের নৌপথ ব্যবহারের সম্মতি লাভের বিষয়ে ভারত সরকারের প্রেসনোট।
নয়াদিল্লি, জুলাই ১, ১৯৭২

বাংলাদেশ সরকারের অনুমতিপ্রাপ্ত হওয়ায় ভারতীয় জাহাজ কলকাতা অথবা গৌহাটি থেকে আসামের কাছাড় জেলায় চলাচলের জন্য বাংলাদেশের নৌপথ ব্যবহারের ট্রানজিট সুবিধা লাভ করেছে। কেন্দ্রীয় শিপিং ও ট্রান্সপোর্ট মন্ত্রণালয় সরকারি খাতের প্রতিষ্ঠান সেন্ট্রাল ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশন লিমিটেডকে ওই এলাকায় অত্যাবশকীয় পণ্য পরিবহনের ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে। এই পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য ভারত সরকার বাংলাদেশ সরকারকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে।

এখানে উল্লেখ্য, ব্রহ্মপুত্র এবং বরাক নদীর ভয়াবহ বন্যার ফলে কাছাড় জেলার সঙ্গে দেশের বাকি অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের নৌপথের এই ব্যবহার বন্যা উপদ্রুত অঞ্চলে জরুরি ত্রাণসামগ্রী পরিবহনে সহায়তা করবে।)

একই বছর নভেম্বরের ১ তারিখে ঢাকায় চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে ভারতকে বাংলাদেশের অভ্যন্তর দিয়ে অন্যান্য রুটে তাদের পণ্য চলাচলের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে নৌ ট্রানজিট প্রদান করা হয়। 'Protocol between the Government of India and the Government of Bangladesh on Inland Water Transit and Trade' শিরোনামের চুক্তিতে বাংলাদেশ ও ভারতের পক্ষে স্বাক্ষর করেন দুই দেশের তত্কালীন নৌ মন্ত্রণালয় সচিব যথাক্রমে এস জেড খান (S. Z. Khan) এবং এমজি পিম্পুটকার (M. G. Pimputkar)। নৌ ট্রানজিট চুক্তিতে দুই দেশের মধ্যকার ১৯৭২ সালের ২৯ মার্চ তারিখে সম্পাদিত বাণিজ্য চুক্তির অনুচ্ছেদ ৫-এর উল্লেখের বিষয়টি তাত্পর্যপূর্ণ এবং সুদূরপ্রসারী। নয়াদিল্লিতে স্বাক্ষরিত 'Trade Agreement between the Government of India and the Government of Bangladesh' শিরোনামের সেই চুক্তির Article 5 অর্থাত্ ৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে—

'The two Governments agree to make mutually beneficial arrangements for the use of their waterways, railways and roadways for commerce between the two countries and for passage of goods between two places in one country through the territory of the other.'

অনুচ্ছেদ -৫
(দুই সরকার এই মর্মে সম্মত হচ্ছে যে, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে সহায়তা প্রদান এবং একটি দেশের এক অংশ থেকে পার্শ্ববর্তী দেশের ভেতর দিয়ে সেই দেশের অপর অংশে পণ্য পরিবহনের লক্ষ্যে উভয় সরকার পারস্পরিক লাভালাভের ভিত্তিতে যার যার দেশের নৌপথ, রেলপথ এবং সড়কপথ ব্যবহারোপযোগী করবে।)

ভারতের একতরফা স্বার্থপূরণে প্রণীত উপরিউক্ত চুক্তিতে ভারত ও বাংলাদেশের দুই তত্কালীন বাণিজ্যমন্ত্রী এল. এন. মিশ্র (L. N. Misra) ও এম আর সিদ্দিকী (M. R. Siddiqui) স্বাক্ষর করেছিলেন। বাংলাদেশের এক অংশ থেকে অপর অংশে ভারতের মধ্য দিয়ে যাওয়ার কোনোরকম ভৌগোলিক প্রয়োজনীয়তা না থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের জনগণকে ধোঁকা দিয়ে কেবল ভারতের স্বার্থ মেটানোর জন্যই বাণিজ্য চুক্তিতে এই উদ্ভট অনুচ্ছেদ সংযুক্ত করা হয়। পাঠকের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি যে, ১৯৭২ সালে প্রণীত তিনটি উল্লিখিত চুক্তির কোনোটিতেই কানেক্টিভিটি শব্দটি কোথাও ব্যবহার করা হয়নি। এই শব্দটি ভারতের বাংলাদেশীয় দালালদের সাম্প্রতিক আবিষ্কার। আমার কাছে এসব চুক্তির যে কাগজপত্র রয়েছে, সেখানে তারিখ সংক্রান্ত একটি বিভ্রান্তিও আমি খুঁজে পেয়েছি, যার উল্লেখ সঠিক ইতিহাস রচনার স্বার্থেই প্রয়োজন বিবেচনা করছি। নভেম্বরের নৌ-ট্রানজিট চুক্তিতে আগের বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের তারিখ ২৯ মার্চ, ১৯৭২ উল্লেখ থাকলেও দিল্লিতে সেই চুক্তি প্রকৃতপক্ষে স্বাক্ষরিত হয়েছিল ২৮ মার্চ। ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্যমন্ত্রী ললিত নারায়ণ মিশ্র ২৯ মার্চ ভারতীয় লোকসভায় বাংলাদেশের সঙ্গে তার দেশের আগের দিনের চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে বিবৃতি প্রদান করেছিলেন মাত্র। আমার ধারণা, নৌ-ট্রানজিট চুক্তির খসড়া প্রণয়নকারীরা পরবর্তীকালে তারিখ গুলিয়ে ফেলেছিলেন।

একবার আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদিত হয়ে গেলে বাংলাদেশের মতো একটি দুর্বল দেশের পক্ষে তাকে রদ করা যে আর সম্ভব হয় না, তার উত্কৃষ্ট প্রমাণ ১৯৭২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের আমলে প্রণীত বাণিজ্য চুক্তি এবং নৌ-ট্রানজিট চুক্তি। ১৯৭২ সালের ২৮ মার্চ তারিখে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তির পাঁচ নম্বর অনুচ্ছেদের সুযোগ নিয়ে পরবর্তীকালে বাংলাদেশের কাছ থেকে ভারত একে একে তার সব ট্রানজিট চাহিদা পূরণ করে নিয়েছে। চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার পরবর্তী দীর্ঘ ৩৯ বছরে আওয়ামী লীগ ছাড়া জেনারেল জিয়া, জেনারেল এরশাদ, বেগম খালেদা জিয়া এবং জেনারেল মইনের সরকার দেশ শাসন করলেও কোনো সরকারের পক্ষেই ওই চুক্তি কিংবা আর্টিকেল পাঁচ রদ বা পরিবর্তন করা সম্ভব হয়নি। বরং ২০০৭-০৮ সময়কালে মইনের জরুরি সরকার দেশবাসীকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে বেআইনিভাবে ভারতকে আকাশপথে ট্রানজিটও দিয়ে দিয়েছে। ফখরুদ্দীন-মইনউদ্দিন সরকারের এই ধরনের চুক্তি করার কোনো সাংবিধানিক অধিকার না থাকলেও মার্কিন-ভারতের সহায়তায় কেবল ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য তত্কালীন শাসকরা দেশের স্বার্থ অকাতরে বিকিয়ে দিয়েছেন এবং পরবর্তী সময়ে যোগসাজশের মাধ্যমে একটি ভারতবান্ধব সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়ে দিয়ে পিঠ বাঁচাতে দল বেঁধে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। সেই সময় নয়া দিগন্ত পত্রিকায় এ বিষয়ে প্রতিবাদ করে একাধিক কলাম লিখলেও এসব দেশবিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে জেনারেল মইন ও ড. ফখরুদ্দীন আহমদকে নিবৃত্ত করতে পারিনি। বাংলাদেশের জনগণও নেশাগ্রস্তের মতো চোখ বুজে কেবল আপন সংসারধর্ম পালনের মধ্যে ব্যাপৃত থেকেছেন। এত আত্মকেন্দ্রিকতায় বিভোর থেকে একটি দেশের স্বাধীনতা রক্ষা করা যায় না।

তত্কালীন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ড. ইফতেখার আহমেদ চৌধুরীর একটি দম্ভোক্তির কথা এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি দাবি করেছিলেন, তত্ত্বাবধায়কের ছদ্মাবরণে সামরিক সরকার ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে এমন একটি পর্যায়ে নিয়ে যাবে, যার পরিবর্তন সাধন করা পরবর্তী কোনো সরকারের পক্ষেই সম্ভব হবে না। চারদলীয় জোট সরকারের সময়কার জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি এবং পরবর্তীকালে এক-এগারোর সহযোগী ড. ইফতেখারের কথা সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। মইন-মাসুদ-মশহুদ-ফখরুদ্দীন গং দেশের চূড়ান্ত সর্বনাশটি সাধন করেই ক্ষমতার দৃশ্যপট থেকে বিদায় নিয়েছেন।

১৯৭২ সালে নৌ-ট্রানজিট সুবিধা লাভের মাধ্যমে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ তাদের প্রথম লক্ষ্য পূরণ করে। স্মরণে রাখতে হবে যে, সর্বদাই তাদের মূল লক্ষ্য ছিল সড়কপথে ট্রানজিটপ্রাপ্তি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার বাণিজ্য চুক্তির পাঁচ নম্বর অনুচ্ছেদে সম্মত হয়ে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশকে মূলত ভারতের একটি ‘ট্রানজিট রাষ্ট্রে’ পরিণত করার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল। ২০১০ সালের ২১ অক্টোবর ঢাকায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ ট্রানজিটের দেশ। আঞ্চলিক সম্পর্ক জোরদারে আমি বিশ্বাসী। আগে ভুটান ও নেপাল সরাসরি আলোচনায় আসেনি। এখন ভারত বলে দেয়ার পর ভুটান ও নেপাল লিংক হয়েছে।’ আমাদের মাতৃভূমি সম্পর্কে আওয়ামী মানসিকতা বোঝার জন্য অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্যই যথেষ্ট। বাংলাদেশের পরজীবী সুশীল (?) সমাজের চিন্তা-চেতনাও আওয়ামী লীগ থেকে ভিন্নতর কিছু নয়। তাই এ দেশের জনগণের নাকের সামনে উন্নত বিশ্বের প্রাচুর্যের কল্পিত মুলা ঝুলিয়ে ট্রানজিটের ইস্যুতে তাদের বিভ্রান্ত করার জন্য ভারত গত প্রায় দুই দশক ধরে এই সুশীল (?) সমাজকেই ব্যবহার করেছে। ঢাকা শহরের পাঁচতারা সব হোটেলে সেমিনার করে বায়বীয় পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে দাবি করা হয়েছে, ভারতকে ট্রানজিট দিলে প্রতি বছর আমরা কমপক্ষে বিলিয়ন ডলার নিট আয় করব, এক ট্রানজিটের ভাড়ায় বাংলাদেশের জাতীয় আয় সিঙ্গাপুরের সমপরিমাণে উন্নীত হবে, একবার কানেক্টিভিটি হয়ে গেলে আমরা সড়কপথে জাপান পর্যন্ত যেতে পারব, ইত্যাদি ইত্যাদি।

সিপিডি, বিলিয়া, হেরিটেজ ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট ইত্যাকার সুশীল (?) সংগঠন বিদেশি আনুকূল্যে পালা করে দিনের পর দিন এসব সেমিনারের আয়োজন করেছে। প্রফেসর রেহমান সোবহান, ড. রহমতউল্লাহ, ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, ওয়ালিউর রহমান, ফারুক সোবহান, মোঃ জমির এবং অন্যান্য ভারতপন্থী বুদ্ধিজীবী-আমলা একজোট হয়ে তাদের লেখায় ও বক্তব্যে ভারতের ট্রানজিটে বাংলাদেশের ‘বেশুমার’ লাভ আবিষ্কার করেছেন। বাংলাদেশের তাবত্ সুশীল (?) ও ভারত সমর্থক মিডিয়ায় দিনের পর দিন ট্রানজিটের পক্ষে প্রচারণা চালানোর ফলে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যকার একটা বৃহত্ অংশ নিঃসন্দেহে প্রভাবিত হয়েছে। এদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মগজ ধোলাইয়ের কাজ মোটামুটি সম্পন্ন হওয়ার পর এখন একই ব্যক্তিদের কণ্ঠে ভিন্ন সুর শোনা যাচ্ছে।

গত তিন মাসে এদের দেয়া বক্তব্য স্মরণ করা যাক। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান ফতোয়া দিয়েছেন, আমরা নাকি ট্রানজিটের বিনিময়ে ভারতের কাছে ভাড়া দাবি করলে একটি অসভ্য জাতিতে পরিণত হব। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভীর থিওরি হচ্ছে, ট্রানজিটের ভাড়া থেকে তেমন একটা অর্থপ্রাপ্তি না হলেও ভারতীয় ট্রাক ড্রাইভারদের জন্য হোটেল, রেস্তোরাঁ ইত্যাদি নির্মাণ করা হলে সেই সেবা খাত থেকে আমাদের প্রচুর আয় হবে। সেইসব ট্রাক ড্রাইভারের মনোরঞ্জনের জন্য লাভজনক আদিম ব্যবসার ব্যবস্থা করা হবে কি-না সে সম্পর্কে অবশ্য তিনি কিছু বলেননি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপুমনি এসব অর্থনীতির ঝুট-ঝামেলায় না গিয়ে দাবি করেছেন, ভারতকে ট্রানজিট না দিলে বাংলাদেশ বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি isolated country তে রূপান্তরিত হবে। তিনি ফতোয়া দিচ্ছেন, ভারতীয় জুজুর ভয় না দেখিয়ে কানেক্টিভিটির স্বার্থে সরকারের অবস্থানকে সমর্থন করা উচিত। মাঝখান থেকে কী উদ্দেশ্য সাধনে জানি না, অনেকটা হঠাত্ করেই তার দীর্ঘদিনের অবস্থান থেকে দৃশ্যত খানিকটা সরে এসে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ভারতকে ট্রানজিট দেয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে বাংলাদেশের স্বার্থ বিশদভাবে দেখার জন্য সরকারকে নসিহত করছেন। ব্যাপারটা আমার কাছে অন্তত বাংলাদেশের সর্বনাশ নিশ্চিত হওয়ার পর এক পাল সুশীল (?) কে সঙ্গে নিয়ে দুই দশকব্যাপী উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণা চালানোর দায়িত্ব এখন এড়ানোর নিষম্ফল প্রচেষ্টার মতোই মনে হচ্ছে। ভারতের চরণতলে মাতৃভূমির স্বার্থ বিসর্জন দেয়ার দুই দশকের প্রক্রিয়ায় কার কতখানি রাষ্ট্রদ্রোহী ভূমিকা ছিল, সেটি ইতিহাস অবশ্যই একদিন নির্মোহভাবে বিচার করবে।

ট্রানজিট ইস্যুতে ক্ষমতাসীন মহাজোট, ভারত সরকার এবং এদেশের সুশীল (?) বুদ্ধিজীবীদের কাজ-কারবার দেখার পর আমাদের কথিত উন্নয়ন সহযোগীদের ভূমিকারও পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। ভারত সরকার তাদের দেশের স্বার্থে যে কোনো মূল্যে বাংলাদেশের বুক চিরে ট্রানজিট পেতে চাইবে, এটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু সরকারি দায়িত্ব পালনের পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতায় বিশ্বব্যাংক, এডিবি, এসক্যাপের (ESCAP) এর মতো বহুপাক্ষিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা আমাকে সবচেয়ে বেশি অবাক করেছে। পুঁজিবাদ সহায়ক এসব প্রতিষ্ঠান যে মূলত পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থরক্ষার জন্যই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেটা আমাদের সবার জানা। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোও এসব অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ সহায়তা নিয়ে থাকে। কিন্তু ভারতের সঙ্গে আমাদের প্রায় প্রতিটি দ্বিপাক্ষিক বিরোধপূর্ণ বিষয়ে অন্তত আমার অভিজ্ঞতায় এদের সর্বদা ভারতের প্রতি অধিকতর নমনীয় দেখতে পেয়েছি।

এর পেছনে দুটো কারণ থাকতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো চীনের সামরিক ও অর্থনৈতিক উত্থানকে ঠেকানোর জন্য যে কৌশল গ্রহণ করেছে, সেখানে আঞ্চলিক পরাশক্তি ভারতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় আধিপত্যবাদী ভারত যেহেতু সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অন্যতম মিত্রে পরিণত হয়েছে, সেজন্য বাংলাদেশের মতো দুর্বল রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষার কোনো প্রয়োজনীয়তা বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো অনুভব করছে না। চীনকে মোকাবিলার জন্য ভারতকে ব্যবহারের বিনিময় মূল্য স্বরূপ দক্ষিণ এশিয়ার মৌরশি পাট্টা আমাদের বৃহত্ প্রতিবেশীকে এক রকম বিনা প্রশ্নে দেয়া হয়েছে।

দ্বিতীয়ত বিপুল জনসংখ্যার ভারতে শিক্ষার মান উন্নত হওয়ার কারণে বিশ্বব্যাংক, এডিবি, এসক্যাপ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানে ভারতীয় নাগরিক এবং ভারতীয় বংশোদ্ভূতরা নীতিনির্ধারণী পদে বেশি সংখ্যায় কাজ করছে। সুতরাং, সেদিক দিয়েও বাংলাদেশসহ অন্য দক্ষিণ এশীয় রাষ্ট্রগুলো অসম প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতার ছদ্মাবরণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা রাষ্ট্রের সম্মতিতে ভারতের ইচ্ছাই একে একে বাস্তবায়িত হচ্ছে। জেনারেল মইনের আমলে ঢাকা-কলকাতা ট্রেন যোগাযোগ উদ্বোধনের দিনে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে বিচিত্র পোশাক পরিহিত তত্কালীন এডিবি প্রতিনিধি মিজ হুয়া দু এবং ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর গান-বাজনার স্মৃতি আশা করি ভুলো বাঙালি মুসলমান এখনও ভুলে যায়নি।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতার প্রসঙ্গ না তুললে আমার রচনাটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিরা ইতিহাসের অন্যতম ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ড শুরু করলে প্রায় এক কোটি বাংলাদেশী উদ্বাস্তু ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করে। দীর্ঘ নয় মাস ধরে ভারতের জনগণ এবং সে দেশের সরকার শরণার্থীদের বাসস্থান এবং খাদ্যের ব্যবস্থা করে আমাদের অবশ্যই গভীর কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছে। অধিকন্তু, বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ এবং তাদের প্রয়োজনীয় অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহেও ভারত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এগুলো সবই ইতিহাস। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পাকিস্তান দ্বিখণ্ডিত হওয়ায় ভারতও কি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক দিক দিয়ে লাভবান হয়নি? জন্মাবধি পাকিস্তান এবং ভারতের মধ্যে চরম বৈরী সম্পর্ক বিদ্যমান না থাকলে ১৯৭১ সালে আমরা কি ভারতের কাছ থেকে একই ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা লাভ করতাম? প্রকৃত ঘটনা হলো, আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতা কোনোভাবেই একতরফা দয়া-দাক্ষিণ্যের কোনো বিষয় ছিল না। স্বাধীনতা সংগ্রামে সহযোগিতা করার জন্য আমরা যেমন ভারতের কাছে কৃতজ্ঞ, একইভাবে নেহরু ডকট্রিনের আলোকে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্য পূরণে ১৯৭১ সালে আমাদের ভূমিকার জন্যও ভারতের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। চল্লিশ বছর আগে এক মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা প্রদান কোনো অবস্থাতেই ভারতকে আমাদের বিরুদ্ধে পানি আগ্রাসন চালানো, সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক নির্বিচারে বাংলাদেশী নাগরিককে বিভিন্ন উপায়ে হত্যা, আমাদের জমি দখল, বাংলাদেশের চারদিকে অবমাননাকর কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ, বাংলাদেশের যুবসমাজকে ধ্বংস করার অভিপ্রায়ে সীমান্ত ঘেঁষে মাদকের কারখানা নির্মাণ এবং আমাদের মাতৃভূমির বুক চিরে তাদের পণ্য ও সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনের ট্রানজিটের জন্য রাস্তা নির্মাণের নামে পুরো দেশটিকেই টুকরো টুকরো করার বৈধতা প্রদান করে না। সত্য কথা হলো, একমাত্র ভারতের প্রয়োজন মেটাতেই ট্রানজিট, বাংলাদেশের এখানে কোনোরকম ফায়দা নেই।

ভারতের কাছ থেকে সুদে টাকা ধার করে আমরা যে রাস্তা নির্মাণ করব, তার ওপর দিয়ে প্রধানত ভারতীয় যানবাহন সেদেশের পণ্য ও অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে চলাচল করবে। ওই রাস্তা দিয়ে আমাদের কোনো পণ্য ভারতের বাজারে প্রবেশ করবে না। একমাত্র ভুটান এবং নেপাল ছাড়া অন্য কোনো দেশের সঙ্গেও ট্রানজিটের রাস্তা দিয়ে বাংলাদেশের কোনো কানেক্টিভিটিও তৈরি হচ্ছে না। ভারতের মধ্য দিয়ে আমরা সড়কপথে চীন, পাকিস্তান যেতে পারলে তবেই তাকে প্রকৃত আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি বলার সুযোগ ছিল। উপরন্তু ট্রানজিট দেয়া হলে বাংলাদেশ ক্রমেই ফিলিস্তিনিকরণ প্রক্রিয়ার দিকে ধাবিত হবে। দেশের জনগণকে নির্বোধ বিবেচনা করার উন্নাসিকতা শাসকশ্রেণী যত তাড়াতাড়ি পরিহার করতে পারেন ততই তাদের জন্য মঙ্গল। যারা বাংলাদেশকে ‘ট্রানজিটের দেশ’ নামকরণ করে হেয় করেন কিংবা কানেক্টিভিটির বিভ্রান্তিকর তত্ত্ব ফেরি করে ভারতের ট্রানজিট জায়েজ করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছেন, ইতিহাস তাদের একদিন নির্ভেজাল রাষ্ট্রদ্রোহী রূপেই বিবেচনা করবে। বাংলাদেশকে অধিকৃত ফিলিস্তিনের দুর্ভাগ্যজনক পরিণতি থেকে রক্ষা করতে হলে এই ট্রানজিটের বিরুদ্ধে একাত্ম হয়ে রুখে দাঁড়ানো প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিকের কর্তব্য। মনে রাখতে হবে, চুক্তি একবার স্বাক্ষরিত হয়ে গেলে সেটি রদ করা দুর্বল দেশের পক্ষে প্রায় অসম্ভব প্রয়াস। ১৯৭২ সালে সম্পাদিত বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য চুক্তির অশুভ পরিণতি দেখার পরও আমরা যদি নির্বিকার ঘরে বসে থাকি, তাহলে একটি quasi-independent রাষ্ট্রের প্রায়মুখাপেক্ষি নাগরিক হওয়াই এদেশের জনগণের চূড়ান্ত বিধিলিপি।

ট্রানজিট চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার আগেই ভারতীয় শাসকশ্রেণী সিলেট থেকে খুলনা পর্যন্ত দখল করে নেয়ার যে হুমকি উচ্চারণ করেছে, তার মাধ্যমে আমার আশঙ্কার সারবত্তা প্রমাণিত হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন প্রতিরোধ করার জন্য জনগণের ট্যাক্সে প্রতিপালিত বিশেষ বাহিনীর দিকে তাকিয়ে থেকে কোনো ফায়দা নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ও বিশিষ্ট পণ্ডিত ড. তালুকদার মনিরুজ্জামান এবং কবি ও চিন্তাবিদ ফরহাদ মজহারের গণপ্রতিরক্ষা তত্ত্ব বাস্তবে রূপ দেয়ার আজ সময় এসেছে।
[সূত্রঃ আমার দেশ, ০৩/০৮/১১]

Thursday, 7 July 2011

মানবাধিকার আইনজীবী গোমেজকে নির্যাতনের রোমহর্ষক কাহিনী











ইলিয়াস খান
মানবাধিকার আইনজীবী উইলিয়াম নিকোলাস গোমেজ তাকে অপহরণ করে একটি গোয়েন্দা সংস্থা ও র্যাব সদস্যরা ব্যাপক নির্যাতন চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন। ই-মেইলে পাঠানো দীর্ঘ অভিযোগপত্রে তিনি নির্যাতনের বিস্তারিত বর্ণনা দেন। পরে টেলিফোনেও তিনি এ নিয়ে কথা বলেন। তার অভিযোগ, গত ২১ মে সায়েদাবাদ থেকে তাকে ধরে নিয়ে অকথ্য ভাষায় গালাগাল এবং উলঙ্গ করে তার ওপর দিনভর নির্যাতন চালানো হয়। একই সঙ্গে পানির সঙ্গে তাকে এমন কিছু পান করানো হয় যে, যাতে বর্তমানে তিনি চরম অসুস্থবোধ করছেন। অ্যাডভোকেট নিকোলাস গোমেজ তার ই-মেইলে স্বাভাবিকভাবে বাঁচার গ্যারান্টি চেয়েছেন। তবে র্যাবের পক্ষ থেকে উইলিয়াম গোমেজকে নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। র্যাবের মিডিয়া ও লিগ্যাল উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার এম সোহায়েল আমার দেশকে বলেন, ‘না এরকম কোনো ঘটনা ঘটেনি।’ অভিযোগ নিয়ে সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করেও সাড়া পাওয়া যায়নি। উইলিয়াম নিকোলাস গোমেজের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে জানা যায়, চিকিত্সার জন্য বর্তমানে তিনি নেপাল রয়েছেন। টেলিফোনে এ আইনজীবী আমার দেশকে বলেন, ‘নির্যাতনের পর গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে এশিয়ান মানবাধিকার কমিশন গত ২৭ মে আমাকে নেপালে নিয়ে আসে। এখানে আমি চিকিত্সা নিচ্ছি। আমার সন্তান স্ত্রী দেশে রয়েছে। জানিনা ওদের ওপর আবার কী নির্যাতনের খড়গ নেমে আসে।’ গোমেজ তার নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা দাবি করেছে। আইনজীবী গোমেজ তার অভিযোগে বলেন, ‘২১ মে শনিবার সকাল। কিছু কাজের জন্য আমি বাইরে বেরিয়েছি। কাজ সেরে যখন সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের কাছ থেকে বাসায় ফিরছিলাম, এক লোক আমাকে ডাক দেন। লোকটি আমার চেয়ে লম্বা, ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি হবে। বাসাবোর দিকে যাওয়ার রাস্তায় অপেক্ষমাণ কালো রঙের একটি মিটসুবিশি জিপ গাড়ির কাছে যাওয়ার অনুরোধ করেন তিনি। আমি সহযোগিতার মানসিকতা নিয়ে গাড়িটির কাছে যাই। আমার ধারণা ছিল লোকটি হয়তো পথ ভুলে গেছেন। কিন্তু গাড়িটির কাছে যাওয়ার পর লোকটি আমাকে আগে থেকেই খোলা থাকা দরজা দিয়ে ধাক্কা মেরে ভিতরে ঢুকিয়ে দেন। এ সময় ভিতরে অন্য একজন লোক বসা ছিলেন। দুই ব্যক্তি আমার ডানে ও বামে বসে পড়েন। তারা আমার নাম উইলিয়াম গোমেজ কিনা জানতে চান। আমি হ্যাঁ বললে তারা আমার চোখে কালো চশমা পরিয়ে দেন, যা চোখে দিলে আর কিছুই দেখা যায় না। একই সঙ্গে আমার মাথায়ও মুখোশ পরিয়ে দেন। তারা আমার ব্যাগ, মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ নিয়ে নেন। এরপর আমার মাথার দু’দিকে অস্ত্র ধরে বলে, ‘কুত্তার বাচ্চা কোনো শব্দ করবি না। তাইলে এখনই গুলি কইরা দিমু। তোরে মারার অর্ডার আছে।’ এ সময় ড্রাইভারের বাম পাশে বসা এক লোক গাড়ি সরাসরি হেডকোয়ার্টারে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। গাড়ি দ্রুত চলতে শুরু করলে হঠাত্ অপহরণকারীদের কাছে একটি ফোন আসে। যার কাছে ফোন তিনি জবাব দেন, ‘স্যার, স্যার, কুত্তার বাচ্চারে ধরছি; স্যার স্যার, এখনই হ্যান্ডকাফ দিতাছি।’ গাড়ি দ্রুতগতিতে চলছিল। এরপরই আমাকে হ্যান্ডকাফ পরানো হয়।প্রায় ৪০ মিনিট চলার পর গাড়িটি একটি জায়গায় থামলে আমাকে বাইরে আনা হয়। দু’জন দু’দিক থেকে আমার হাত ও কাঁধ ধরে সামনে হাঁটতে বলে। আমি বললাম, ‘আমি দেখতে পারছি না। কিভাবে সামনে যাব? তখন একজন আমাকে বলে, ‘কুত্তার বাচ্চা দেখস না? র্যাবের সবকিছু তোরা দেখস। এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন, অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তোর বাপেরা কিভাবে বাঁচায় দেখব।’তারা আমাকে কোনো একটা কিছুর মধ্যে ঢুকায় এবং একজনকে ৯-এ চাপ দিতে বলে। তখন আমি বুঝলাম এটা লিফট। আমি কোনো একটি ভবনের নবম তলায় যাচ্ছি। তারা আমাকে একটি রুমে ঢোকায় এবং সম্পূর্ণ নগ্ন করে ফেলে। কেউ একজন বললেন, ‘জারজের বাচ্চা মুসলমানি করা, আবার নাম দিছে খ্রিস্টান। এই কুত্তার বাচ্চা র্যাব, আর্মির বিরুদ্ধে কাজ করবে না কে করবে? সব জারজগুলা এই কাজ করে।’তখন অন্য লোকটি বললেন, ‘তাড়াতাড়ি! ব্রিগেডিয়ার স্যার আসছেন। এখন বেশি কথা বলা যাবে না। স্যারেরা তাদের কাজ করবেন; অনেক মোটা ফাইল আছে কুত্তার বাচ্চার নামে।’ তারা আমাকে ফ্লোরে ফেলে দেয় এবং বলে, সেজদা দে কুত্তার বাচ্চা।’আমি বুঝতে পারছিলাম না কী বলব। তখন এক লোক আমাকে জোর করে সেজদার মতো করায় এবং বলে মাথা যেন ফ্লোরে না লাগে। আবার বলে, ‘সেজদা দিয়া থাকবি জারজের বাচ্চা। মাথা তুলবিতো ... গরম ডিম দিমু। হঠাত্ লোকটি আমার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দেয় এবং বলে, স্যার স্যার, বিষয় রেডি।’ পুরো শরীরে কোনো কাপড়চোপড় না থাকায় আমি ভীষণ ঠাণ্ডা অনুভব করছিলাম। এ সময় একটি অপরিচিত কণ্ঠ জানতে চায়, ‘উইলিয়াম গোমেজ, শেষ কবে বিদেশে গিয়েছিলে? ‘গত আগস্টে মনে হয়’—আমি উত্তর দেই। ‘তুই তারিখ ভুলে গেছস, খানকির পোলা। জারজের বাচ্চা, আরটিএইচকে (রেডিও টেলিভিশন হংকং) গিয়া কী কইছস ভুইলা গেছস? কত টাকা পাইছস এইসব দেশবিরোধী কথা বলার জন্য?’ আমি খারাপ কিছু বলিনি জানালে তারা আরটিএইচকে রেডিও প্রোগ্রাম চালু করে এবং বলে, ‘তুই আর তোর এএইচআরসি একমাত্র ভালো, আর হাসিনা খারাপ?’এ সময়ে আমি দু’বার ফ্লোরে পড়ে যাই। আমি অনুভব করলাম আমার নাক দিয়ে রক্ত পড়ছে। আমি ভীষণ ঠাণ্ডা অনুভব করছিলাম। এ পর্যায়ে তারা আমার কাছে জানতে চায়, শেষ কবে আমি খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাত্ করেছি? টাকা কোথায়? যে কোটি টাকা পেয়েছো তা কোথায়? আমি বললাম জীবনে কখনও খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করিনি। আমি একজন ধর্মনিরপেক্ষ লোক হিসেবে কখনও কোনো ডানপন্থী লোকের সঙ্গে মিশি না। তখন নতুন কণ্ঠে শুনলাম, ‘কুত্তার বাচ্চা, মিশুর (গার্মেন্ট আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকায় কারাবরণকারী মোশরেফা মিশু) কেসে খালেদা জিয়ার কাছ থেকে কত টাকা পাইছস?’এ অবস্থায় একজন, যিনি ইংরেজিতে কথা বলছিলেন, ভিনদেশি বলে মনে হয়েছে, আমার কাছে জানতে চাইলেন, ‘এএইচআরসি আপনাকে সোর্স মানি হিসেবে কত টাকা দিয়েছে? র্যাব এবং পুলিশে আপনার কত লোক আছে?’ তিনি আরও জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি মিশুর বিবৃতি কাস্টডি থেকে কিভাবে সংগ্রহ করলেন? আপনি মিশুর মুক্তির জন্য দক্ষিণ কোরিয়ায় কিভাবে প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করলেন?আমি নীরব থাকলাম। কেননা আমার মনে হচ্ছিল আমার মগজ মাথার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে। তখন একজন জিজ্ঞাসাবাদকারী, যিনি আগেও আমাকে প্রশ্ন করেছেন, বললেন, ‘কুত্তার বাচ্চা চুপ কেন? গলা ফাটাইয়া তোর বাপেরা তো সারা পৃথিবীতে কইতাছে র্যাব নিষিদ্ধ করতে। তোর বাপেদের নিষিদ্ধ করমু, আজকে তোরে আগে নিষিদ্ধ কইরা নেই।’এরপর তারা জানতে চাইলেন, পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে কবে গিয়েছিলাম? আইএসআই কর্মকর্তাদের সঙ্গে কখন দেখা করেছি?আমি বললাম, কখনও কাশ্মীর যাইনি। তারা বলল, আমাদের কাছে তথ্য আছে যে, তুই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, র্যাব ও পুলিশ ধ্বংস করার জন্য আইএসআই কর্তৃক নিযুক্ত হয়েছিস।আমি বললাম, আমার আইএসআই’র কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে কখনও দেখা হয়নি। আমি একজন মানবাধিকার কর্মী। আমি শুধু এএইচআরসি’র জন্য কাজ করি। তারা বলল, ‘আমরা জানি যে, তুই এএইচআরসি’র দালাল। তারা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মহা শত্রু। তোর বস বাংলাদেশ সফরে এসে বলে গেছে, সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করবে। বাসিলের (এএইচআরসি’র সাবেক নির্বাহী পরিচালক) সমস্যা কী? ওই কুত্তার বাচ্চা তো নিজ দেশ থেকে বহিষ্কার হয়েছে। কুত্তার বাচ্চার সাহস কীভাবে হয়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কথা বলার।... পোলা, তুই বীরগঞ্জ (দিনাজপুর জেলার একটি থানা) থানা পুড়িয়ে দেয়ার জন্য টাকা দিছস। ডিজিএফআই, এনএসআই রিপোর্টে তাই কয়। এএইচআরসি আর আইএসআই কত টাকা দিছিল? পুলিশের অসম্মান করস? তোর বাপেরা আইসা দেশ চালাইব? তোর সব মেইল আমাদের কাছে আছে? ক কুত্তার বাচ্চা! থানা বার্ন করতে কারে কত টাকা দিছস?’আমি বললাম, ‘আমি সব সময় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে। এএইচআরসি থেকে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ শিখিনি।’তখন ওই লোকটি বললেন, ‘আহারে! কত সাধু! তোরাই দেশের সম্মান শেষ কইরা দিতাছস। দেশের উন্নয়ন বন্ধ কইরা দিতাছস। দেশের বাইরে মুখ দেখাইতে পারি না।’অন্য একজন তখন জিজ্ঞেস করলেন, মানবাধিকার কর্মী রাজ্জাকের ঘটনায় সেনা কর্মকর্তাদের মানহানি ঘটাতে কত টাকা পেয়েছিস? আমি বললাম, ‘আমি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নই। কিন্তু সেখানে কিছু খারাপ লোক আছে। ক্ষমতা গ্রহণের সময় তারা কিছু মানুষ হত্যা করে। লোকটি তখন বললেন, কুত্তার বাচ্চা! আর্মি খারাপ আর তোমরা ভালো? জারজের বাচ্চা! এনএসআই’র ফাইলে তোর চৌদ্দগুষ্টির খবর আছে। তোর বাপেদের সব খবর আছে। তুই দুলালকে ডিস্টার্ব করস কেন? রাজিব সজীবরে ডিস্টার্ব করস কেন? এই সময় হঠাত্ করে ফোন বেজে উঠল। ফোন ধরে একজন বললেন, স্যার, স্যার, শেষ পর্যায়ে, স্যার।তখন ওই বিদেশি, যিনি মাতৃভাষা ইংরেজিতে কথা বলছিলেন, জানতে চাইলেন, বাসিল কখন বাংলাদেশে আসবেন?বললাম, বাসিল সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোর বস আসরাফুজ্জামান কখন আসবে? আমি আবারও বললাম জানি না।’আমি তখন খুব তৃষ্ণার্ত বোধ করছিলাম। পানি চাইলাম। একটি লোক আমাকে পানি দিল। পানি একটু গরম ছিল এবং স্বাদ স্বাভাবিক পানির মতো নয়। অন্য লোক বললেন, ‘রাজ্জাক একটা দালাল ও প্রতারক। আমাদের ভালো কর্মকর্তা তোর মতো ডাকাতদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করেছেন। তিনি তার ভাইকে জারজ রাজ্জাককে ধরে এনে চোখ তুলে দেয়ার নির্দেশ দেন। বলেন, চোখটা তুইলা নে। এই কুত্তার বাচ্চা শালার পোলা যেন আর দেখতে না পারে। কুত্তার বাচ্চা রাজ্জাকের জন্য আমাদের ঘুম হারাম। সব জায়গা থেইকা শুধু মেইল আর চিঠি। তুই কুত্তার বাচ্চা ক—কত টাকা পাইছস? পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেটদের বলে দেয়া হয়েছে। এই বার যত খুশি ফাইট কর। ওই শালার পোলা রাজ্জাকের কেস এ কোর্ট আর পুলিশকে আমরা যা রায় দিতে কমু, তাই দিবে।এ সময় অন্য একজন বললেন, এএইচআরসিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কুত্তার বাচ্চা আছে। আমি তাকে চিনি কিনা জানতে চাইল। বললাম, না। তখন লোকটি বললেন, ‘কুত্তার বাচ্চা তুই চিনস না? আমরা তাকে ভালো শিক্ষা দিয়েছি। সবগুলা দেশদ্রোহী। এইগুলা এই দেশে থাকার যোগ্য নয়। পাসপোর্টগুলো নিয়ে ফেলা দরকার এই কুত্তার বাচ্চাদের।’ আমার কাছে আরও জানতে চাওয়া হলো, কূটনৈতিক মিশনের কারা আমাদের সাহায্য করছে, কোন দেশ অর্থের জোগান দিচ্ছে? আমি বললাম, আমাদের কোনো ফান্ড নেই। জানতে চাইল, কেন আমি ভারতের জেলে আটক বাংলাদেশীদের সম্পর্কে আগ্রহী? কেন আমি ভারতের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকা সরকারের নিন্দা করছি?ওই লোক আরও জানতে চাইলেন, সরকারের ভেতরের তথ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছে কে সরবরাহ করেছে? তারা পোস্টার এবং স্টিকার সম্পর্কে জানতে চাইলেন। প্রশ্ন ছিল, পোস্টার ও স্টিকারের নকশা কে করেছে, কে ছাপিয়েছে? বললাম, ডিজাইনারকে চিনি না। একমাত্র জামান ভাই (এএইচআরসি’র স্টাফ মেম্বার) জানেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা ইনস্টিটিউটে তার বন্ুব্দ রয়েছেন। কিন্তু যিনি ছাপিয়েছেন তাকে এবং প্রেসও চিনি। কিন্তু সঠিক ঠিকানা জানি না। তারা জানতে চাইলেন, তুই এসব জিনিস পার্লামেন্টে পাঠিয়েছিস কেন? আমরা সংসদ সদস্যদের কাছ থেকেও অভিযোগ পেয়েছি। তারা নির্যাতন নিয়ে আইন করার কথা বলছিলেন। তাদের জানা উচিত, এই আইন কখনোই পাস হবে না। আমরা এটা নিশ্চিত করব।’এসময় একজন কর্মকর্তা বললেন, ওর বিরুদ্ধে একটা রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দেন। তখন অন্য একজন বললেন, না একটা জঙ্গি মামলা দেই। তখন বিদেশিরা বলবে, ও একটা সন্ত্রাসী।আমি কান্না শুরু করলাম। বললাম, আমার ছোট দুটি ছেলে আছে। দয়া করে আমাকে মাফ করে দিন। আমি কখনও আর এ ধরনের কাজ করব না।তখন তাদের একজন বললেন, ‘কুত্তার বাচ্চা। তুমি করবা না। তোমার বাবারা তো আজকেই আসতাছে। বিজো ফ্রান্সিস ও জিজো পল। আমরা জানি না মনে করছ! হারামির বাচ্চা, আমাদের ঘুম হারাম কইরা আবার বাইরে থেকে হারামির বাচ্চাদের ডাইকা নিয়া আনতাছো। দেশের উন্নয়ন আর সম্মান শেষ কইরা দিতাছস। আমি বললাম, ‘আমি আর কখনও এএইচআরসিতে যাব না, কাজও করব না। তখন লোকটি বললেন, তোর কাজ ছেড়ে দেয়ার দরকার নেই। বিজো এবং জিজো বাংলাদেশে থাকা পর্যন্ত ভালোভাবে কাজ কর। আমাদের বৈঠক সম্পর্কে তাদের কিছু বলবি না। স্বাভাবিকভাবে কাজ কর। আমাদের কথা ভালোভাবে শোন। না হলে আমরা জানি কীভাবে শোনাতে হয়।তখন আমাকে তারা অন্য একটি রুমে নিয়ে প্যান্ট শার্ট পরতে বলে এবং রুম থেকে বের করে নিয়ে এসে একই গাড়িতে তোলে। আমার চোখ খুলে দিলে দেখতে পাই, সেই একই ব্যক্তি গাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে আছেন এবং তার হাতে আমার ব্যাগ, মোবাইল ফোন এবং মানিব্যাগ রয়েছে। সেই একই গাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে লোকটি বললেন, ‘কুত্তার বাচ্চা! মুখ খুললে মাগুর মাছ দিয়া খাওয়ামু। আমরা তোর সব দেখতাছি।এই দিনের পর থেকে আমার শারীরিক অবস্থা ক্রমান্বয়ে খারাপ হচ্ছে। পানিতে কিছু মিশিয়ে দিয়েছিল বলে আমার ধারণা। আমার দু’পা বিশেষ করে হাঁটু এবং জোড়া ব্যথা করছে। কখনও কখনও অবশের মতো মনে হয়। হাতে কোনো জোর পাই না। মনে হচ্ছে, যে কোনো সময় পড়ে যাব। ঠিকভাবে ঘুমোতে পারি না। কোনো ছোট্ট শব্দও আমার কাছে খুব বড় মনে হয়। আমার মেরুদণ্ডেও ব্যথা হচ্ছে। আমি প্রায়ই কান্নায় ভেঙে পড়ি, যখন মনে পড়ে তারা আমাকে উলঙ্গ করে এবং জারজ নামে ডাকে।আমার এখন আত্মহত্যা করতে ইচ্ছা করে। তারা আমাকে অপমান-অপদস্ত করেছে। কিন্তু আমি কিছুই করতে পারিনি। আমার মনে হচ্ছে, আমার জীবন শেষ হয়ে গেছে। তারা আমাকে সকাল সাড়ে ১০টায় নিয়ে যায় এবং বিকাল সাড়ে ৩টায় বাসায় ফিরে আসি। আমি নির্যাতনের ঘটনা একটি মুহূর্তের জন্যও ভুলতে পারি না। আমি খুব কষ্ট পাই যখন মনে পড়ে আমাকে উলঙ্গ করার কথা এবং দাসের মতো নাকে খত দেয়ার কথা। আমার বিরুদ্ধে আইএসআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ থাকার অভিযোগ এনেছে। কিন্তু আমি এ ধরনের লোক নই। আমার জীবনে কখনও কাশ্মীর বা পাকিস্তান যাইনি। আমি খুব হতাশ এবং ক্লান্তি বোধ করছি। আমার মাথায় ব্যথা হচ্ছে। আমার মাথার মধ্যে কী যেন ঘুরছে। আমাকে যারা উলঙ্গ করেছে তাদের জানাতে চাই, আমি ক্ষমতাহীন, গরিব ও দুর্বল লোক। কিন্তু আমি নির্ভীক। নিরাপত্তা বাহিনী যেভাবে হত্যা করে, তাদের হাতে আমি সেভাবে নিহত হতে চাই না। আমি ভালোভাবে ঘুমাতে চাই। আমি এখনও মানবাধিকার আইনজীবী হিসেবে বেঁচে থাকতে চাই
।

Thursday, 9 June 2011

নন্দিত নিন্দিত সমালোচিত দিন বদলের বিচারপতি i

আবদুল কাদের সুঘ্রাণ

আমাদের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে আমরা অনেক হাস্য রসাত্নক ঘটনা দেখেছি। সরকারের পরিবর্তনে একটি বিচারের ভিন্ন ভিন্ন রায় আমরা প্রত্যক্ষ করেছি।আমাদের বিচারালয় সব সময় সকল অবৈধ শাসকের শয্যাসঙ্গীর ভুমিকা পালন করতে দেখেছি।সর্বশেষ গত সেনা সমর্থিত সরকারের সময়ে বিশেষ আদালতের বিচারকদের মনোচিকিৎসকের ভুমিকা আমাদের ভাবিয়েছে।মনোচিকিৎসক বলছি এজন্য তখন বিচারক কথিত রাজনৈতিক দুর্নীতিবাজদের চেহারার দিকে তাকাতেন, আর রায় দিতেন, লোকটা যত বছর বাচবে তত বছর জেল।


দেশের বিচারাঙ্গনের ইতিহাসে সর্ব্বোচ্চ নন্দিত নিন্দিত সমালোচিত নাম বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক।

সরকারী দলের মতে- বিদায়ী প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক, বিশ্বের ২০ জন শ্রেষ্ঠ বিচারপতির একজন। এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, তিনি বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থাকে বিশ্বমানে নিয়ে গেছেন। ‘বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা ইতিহাসে খায়রুল হক স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

বিরোধীদলের মতে- নন্দিত নয় নিন্দিত হয়ে বিদায় নিয়েছেন দেশের ঊনিশতম প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক। একযুগের বিচারিক জীবনে গণমানুষের ন্যায় বিচারের স্বার্থে আপিল বিভাগে বিচারাধীন মামলা জট কমাতে কোন পদক্ষেপ না নিয়ে সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও স্বার্থ সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো নিষ্পতির দিকে তার নজর ছিল বেশী। এসব মামলা দ্রুত শুনানি করে ধারাবাহিকভাবে রায় দিয়ে গেছেন। মামলার রায় সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণে সহায়ক হওয়ায় তিনি হয়ে উঠেছেন সরকারের আস্থাভাজন। এর ফলে তিনি ব্যক্তিগত স্বার্থ আদায় করে বর্তমান সরকারের আমলে আপিল বিভাগে নিয়োগ পান এবং জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘেনের মাধ্যমে প্রধান বিচারপতি হন। এতে তিনি ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হলেও বিতর্কিত হয়েছে দেশের বিচার বিভাগ।সংবিধানকে লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে দেশ ও জাতিকে এক ভয়ঙ্কর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছেন তিনি।

প্রধান বিচারপতি হিসেবে গত সাত মাসের দায়িত্ব পালনকালে তিনি আদালতকে ব্যবহার করে একের পর এক বিতর্ক উসকে দিয়েছেন। যার ফলে দেশের রাজনৈতিক মাঠ হয়ে উঠছে উত্তপ্ত। দেশে চলমান সাংবিধানিক শূন্যতার যে অভিযোগ এর জন্য দায়ী তিনিই। সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করার মাধ্যমে এই সাংবিধানিক শূন্যতার সূচনা। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল,সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে করা পঞ্চম সংশোধনী বাতিল,সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের করা সপ্তম সংশোধনী বাতিল, বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতার ঘোষক স্বীকৃতি, নোবেল বিজয়ী ড. মুহম্মদ ইউনূসকে অপসারণের সরকারি আদেশকে বৈধতা দেয়া,বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে সেনানিবাসের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি নিয়ে দায়ের করা লিভ টু আপিল না শুনেই তিনি উত্থাপিত হয়নি মর্মে খারিজ করে দেয়া এবং দৈনিক আমার দেশের সম্পাদক কে সাজা দেয়ার ঘটনা তার সময়েই ঘটেছে।

সরকার পক্ষে অভূতপূর্ব নজিরবিহীন রায় দেয়ার ঘটনায় বর্তমান সরকার নিজেই চরম অভিভূত।আওয়ামীলীগের অনেকেই তার রায়ে হতভম্ব।আওয়ামীলীগ নিজেই এতটুকু আশা করেনি। বিচারপতি তাদের পক্ষে রায় দিবে এটা তারা জানতো। কিন্ত এতবেশী পক্ষপাতিত্ব করবে এটা সরকার ভাবেনি।তার রায়ে প্রধাণমন্ত্রী ও বিব্রত হয়েছেন। ঢাকার একটি সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিচারপতিদের প্রতি সব ধরনের ভয়-ভীতি, রাগ-অনুরাগ ও আবেগ পরিহার এবং সর্বোচ্চ নিরপেক্ষতা বজায় রেখে বিচারকার্য পরিচালনার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
দেশের আইনজীবীদের শীর্ষ সংগঠন সুপ্রিমকোর্ট বার এসোসিয়েশন অভিযোগ করেছে প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্বপালনের গত সাত মাসে এ বিএম খায়রুল হক বিচার বিভাগকে ধ্বংস করতে যা কিছু করার সবই করেছেন। বারের পক্ষ থেকে দেশে সাংবিধানিক শূন্যতার জন্য তাকে দায়ী করে বলা হয়েছে পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে এটা করা হয়েছে। অথচ মুন সিনেমা হলের সম্পত্তির জন্য পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করার দরকার ছিলনা আবার তিনিই পঞ্চম সংশোধনীর নিজের পছন্দমত কিছু ধারাকে বৈধতা দেন। বারের পক্ষ থেকে এজন্য এবিএম খায়রুল হককে অমার্জনীয় এ অপরাধের জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং আগামী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা না হওয়ার ঘোষণা দাবি করা হয়েছিল।

বিদায়ী প্রধান বিচারপতি সম্পর্কে এক কথায় মূল্যায়ন করতে একজন সাংবাদিক জানতে চাইলে বার সভাপতি বলেন, তিনি ভদ্র এবং চালাক লোক। বিচার ব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে সাম্ভব্য সব কিছু তিনি করে গিয়েছেন। নির্দ্বিধায় তিনি আপনার গলায় ছুরি চালিয়ে দেবেন আপনি টেরও পাবেন না।
খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দেশের একটি প্রতিষ্ঠানও দলীয়করণের বাইরে নেই। সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগকেও আওয়ামী লীগের অংশে পরিণত করা হয়েছে। বিচার বিভাগের অভিভাবক হিসেবে অধিষ্ঠিত হয়ে প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক পুরোটা সময় আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। হাইকোর্টের কোনো একটি ডিভিশন বেঞ্চ সরকারের বিপক্ষে রায় দেয়ার পরপরই তিনি ওই বেঞ্চের ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে সর্বোচ্চ আদালতে দলীয়করণের ন্যক্কারজনক অধ্যায় রচনা করেছেন। আওয়ামী লীগের নির্বাহী পরিষদে গৃহীত সিদ্ধান্তই আপিল বিভাগের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ সুযোগে আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে সরকার দেশ চালায়।

সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক শপথ ভঙ্গ করেছেন অভিযোগ করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ার বলেছেন, বিশ্বাসঘাতক খায়রুল হককে একদিন জনতার কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। সংবিধান নিয়ে চলমান অনিশ্চয়তা সৃষ্টিতে সরকারের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন তিনি।বিচারপতি খায়রুল হক পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করলেও কুখ্যাত চতুর্থ সংশোধনী নিয়ে কোনো একটি কথাও বলেননি। পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করতে হলে বাকশালে ফিরে যেতে হবে। আর বাকশালের কী পরিণতি হয়েছিল তা সবাই জানে। খায়রুল হক নিম্নমানের ভাষায় এ রায় লিখেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এমন ভাষায় অন্য কোনো বিচারপতি রায় দিয়েছেন বলে আমার জানা নেই।

আমারদেশের একটি অনুসন্ধানী রিপোর্টে প্রকাশিত- প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে ১০ লাখ টাকা নিয়েছেন সদ্য সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক।২০০৯ সালের ২১ জুন শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে রায় দেন বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক। রায়ে বলা হয়—জিয়া নয়, শেখ মুজিবুর রহমানই স্বাধীনতার ঘোষক। এই রায়ের কয়েক দিন পর একজন তরুণ সংসদ সদস্য ও সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী চেকটি বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের কাছে তার দফতরে পৌঁছে দেন বলে জানা গেছে। ২০০৯ সালের ২৭ জুলাই সোনালী ব্যাংকের সুপ্রিমকোর্ট শাখায় বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে এ টাকা জমা হয়। তখন বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি ছিলেন। অ্যাকাউন্টে জমা হওয়ার দিনেই তিনি আবার ৯ লাখ টাকা উত্তোলন করেছেন।
তার বিরুদ্ধে অভিযোগের ব্যাপারে খায়রুল হক বলেন- আমি এ বিষয়ে কিছু বলব না। আপনারা প্রধানমন্ত্রীর অফিসকেই জিজ্ঞাসা করুন। আমি রিটায়ার করেছি। প্লিজ ফর গডস সেক, লিভ মি অ্যালোন। আমাকে অ্যাম্বারাস করছেন কেন। আমরা বলতে চাই দেশের সকল মানুষকে সংঘাত সংঘর্ষের মধ্যে ঠেলে দিয়ে আপনি লিভ মি অ্যালোন বলতে পারেন না।দেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, আগামী দিনের রাজনৈতিক সংঘাত, প্রাণহানি, এবং আরেক ওয়ান ইলেভেনের উজ্জল সম্ভাবনার জন্য নিঃসন্দেহে আমাদের দিন বদলের বিচারপতি শতভাগ দায়ী।তার কর্ম তৎপরতার মধ্য দিয়ে তিনি জাতিকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ধাবিত করেছেন। ইতিহাস কখনো তার এ আচরণ কে ক্ষমা করবেনা। সময়ের ব্যবধানে তাকে আবার এ আদালতেই বিচারের জন্য দাড়াতে হতেও পারে।



লন্ডন
sugrankader@yahoo.com

Mobile:+44(0)7800508730
__._,_.___